ঢাকা ০৪:৩৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কর্মসংস্থানের তীব্র সংকটে সুন্দরবন উপকূলের মানুষ

সুন্দরবন উপকূলে গত ৩০ বছরে কমেছে ২২ শতাংশ ফসলি জমি। লবণাক্ততা বাড়ায় অনাবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে ৭ শতাংশ। নেই বিকল্প কর্মসংস্থানের বড় কোনো উদ্যোগও। এ অবস্থায় জীবিকার খোঁজে বিদেশে পাড়ি জমালেও প্রতারিত হয়ে দেশে ফিরেছেন অনেকে।
সুন্দরবন সংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বাসিন্দা হাফিজ ইসলাম। সাড়ে ৫ লাখ টাকা খরচ করে অবৈধভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে গিয়েছিলেন তিনি। এক পর্যায়ে কাজ না পেয়ে জেল খেটে আট মাস পর দেশে ফিরেছেন শূন্য হাতে।
ধারদেনা করে সৌদি আরব গিয়েছিলেন একই এলাকার মোজাহিদ। দেশটিতে গিয়ে তিন মাস না যেতেই ফিরেছেন প্রতারিত হয়ে। কাঠমিস্ত্রির কাজ করে এখন চালাচ্ছেন সংসার।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ) -এর তথ্য বলছে, লবণাক্ততায় গত ৩০ বছরে এই এলাকায় ফসলি জমি কমেছে ২২ শতাংশ। ফলে কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ায়, কর্মসংস্থানের তীব্র সংকটে এখানকার মানুষ। যাদের একটি বড় অংশ কাজের খোঁজে পাড়ি জমাচ্ছেন বিদেশে।
ওকাপ বলছে, সুন্দরবনের বাসিন্দাদের ১৬ ভাই জীবিকার জন্য বিদেশ গিয়েছেন। তবুও, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা কমাতে উপকূলীয় অঞ্চলে নেই বিকল্প কর্মসংস্থানের বড় কোনো উদ্যোগ।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের চেয়ারপার্সন শাকিরুল ইসলাম বলেন, কেউ যদি মনে করে যে আমি মাইগ্রেশন করতে চাই না তাহলে তার জন্য প্রক্রিয়া কতটা সহজ করা যায়, সেখানে যেনো সে তার পরিবার, সমাজ, সবকিছু নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে তার জন্য তার যত ধরনের অধিকার আছে, যে ধরনের সুযোগ সুবিধাগুলো সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার ইতিহাস সবসময়ই নদীর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে। কিন্তু গত দুই দশক এ জনপদের জন্য এক আমূল পরিবর্তনের অধ্যায়। এক সময় যে মানুষগুলোর পরিচয় ছিল গর্বিত কৃষক হিসেবে, যাদের গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ ছিল, আজ তারা অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে নিজেদের আদি পেশা ভুলতে বসেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে উপকূলের মাটি ও পানিতে যে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়েছে, তা কেবল পরিবেশকেই বিপন্ন করেনি; বরং উপকূলীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকার মানচিত্রে এক স্থায়ী ও বেদনাদায়ক পরিবর্তন এনেছে।
বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্তও খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও পটুয়াখালীর মতো জেলাগুলোর অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল কৃষি। দিগন্তজোড়া আমন ধানের খেত ছিল এখানকার সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু গত ২৫ বছরে এই চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত জমির পরিমাণ জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে এই পরিবর্তন ত্বরান্বিত হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ঘূর্ণিঝড় রেমাল সেই কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে।
লবণাক্ত পানি কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ার ফলে ধানের উৎপাদন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। যে জমিতে আগে বছরে দু-তিনবার ফসল ফলত, সেখানে এখন বছরের অধিকাংশ সময় লোনা পানি থৈ থৈ করে। ফলে হাজার হাজার কৃষক তাদের বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা কৃষি পেশা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। এটি কোনো শৌখিন পেশা বদল নয়, বরং এটি হলো সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি বা টিকে থাকার কৌশল। একজন কৃষক যখন দেখেন তার চোখের সামনে সোনার ফসল নোনা পানিতে জ্বলে যাচ্ছে, তখন পেশা পরিবর্তন ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকে না।
উপকূলীয় জীবিকা পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান উদাহরণ হলো ধান চাষ ছেড়ে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষে ঝুঁকে পড়া। গত দুই দশকে এই অঞ্চলটি কার্যত চিংড়ি মহলে পরিণত হয়েছে। একে বলা হচ্ছে সাদা স্বর্ণ বা হোয়াইট গোল্ড, কিন্তু এই স্বর্ণের পেছনের গল্পটি বেশ করুণ।
কৃষি জমিতে লোনা পানি আটকে চিংড়ি চাষ করা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মনে হলেও এটি কর্মসংস্থানের ব্যাপক সংকোচন ঘটিয়েছে। কারণ, এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে যে পরিমাণ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, চিংড়ি ঘেরে তার চেয়ে অনেক কম শ্রমিকের দরকার পড়ে। ফলে কৃষিজমি যখন ঘেরে রূপান্তরিত হয়, তখন বিপুলসংখ্যক কৃষি শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন।
তা ছাড়া, এই পেশাগত পরিবর্তনে এক ধরনের শ্রেণি বৈষম্য তৈরি হয়েছে। যারা ধনী ও বড় জমির মালিক, তারা চিংড়ি চাষ করে আরও ধনী হয়েছেন। অন্যদিকে প্রান্তিক কৃষক, যার অল্প জমি ছিল, তিনি লোনা পানির কারণে চাষাবাদ করতে না পেরে নামমাত্র মূল্যে জমি ইজারা দিতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে একসময়ের স্বাধীন কৃষক আজ নিজের জমিতেই অন্যের ঘেরের পাহারাদার বা দিনমজুরে পরিণত হয়েছেন। এই পেশাগত অবনমন বা ‘ডি-ক্লাসিফিকেশন’ উপকূলীয় সমাজকাঠামোকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে।
কৃষি ও মৎস্য খাতের এই পালাবদলে যারা কাজ হারিয়েছেন, তারা কী করছেন? গত দুই দশকে উপকূলে অপ্রাতিষ্ঠানিক পেশার এক বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে, যা মূলত হতাশা থেকে জন্ম নেওয়া। কৃষিকাজ হারানো মানুষেরা এখন ভ্যান-রিকশা চালানো, ইজিবাইক চালনো, চায়ের দোকানদারি কিংবা ইটভাটায় শ্রম বিক্রির মতো পেশা বেছে নিচ্ছেন।
বিশেষ করে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বনজীবী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ মধু সংগ্রহ, গোলপাতা আহরণ কিংবা নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরার কাজ করছেন। কিন্তু সেখানেও লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের থাবা। লোনা পানির কারণে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র বদলাচ্ছে, মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে যারা নদী বা বনের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতে চেয়েছিলেন, তারাও এখন অনিশ্চয়তার মুখে। ২০২৪-এর রেমাল পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, বহু মানুষ ত্রাণ নির্ভর হয়ে পড়েছেন, কারণ তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের আর কোনো সুযোগ অবশিষ্ট নেই।
লবণাক্ততা উপকূলীয় নারীদের কর্মজীবনেও বড় প্রভাব ফেলেছে। পরিবারের পুরুষ সদস্য যখন কর্মহীন হয়ে পড়েন, তখন সংসারের হাল ধরতে নারীরাও ঘরের বাইরে আসতে বাধ্য হন। গত দুই দশকে চিংড়ির পোনা ধরা বা রেণু সংগ্রহ উপকূলীয় নারীদের অন্যতম প্রধান পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোমর সমান লোনা পানিতে দাঁড়িয়ে দিনের পরদিন চিংড়ির পোনা সংগ্রহ করতে গিয়ে এই নারীরা ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন। লোনা পানির সংস্পর্শে তাদের চর্মরোগ, জরায়ু সংক্রমণ এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হচ্ছে। তবুও, অভাবের তাড়নায় তারা এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশা ছাড়তে পারছেন না। কৃষিভিত্তিক সমাজে নারীরা যেখানে বাড়ির আঙিনায় বা কৃষি কাজে সহায়তা করতেন, এখন তারা লোনা পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুন্দরবনের সংরক্ষিত এলাকা বৃদ্ধি, বনদস্যুদের উৎপাত, অসাধু দাদন ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের দৌরাত্ম্য এবং বনসম্পদ আহরণে নানা বিধিনিষেধের কারণে গত এক দশকে বননির্ভর মানুষের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে| ফলে মাছ, কাঁকড়া, মধু ও গোলপাতা সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করা পরিবারগুলোর অনেকেই এখন পেশা পরিবর্তন কিংবা এলাকা ছেড়ে অন্যত্র কাজের সন্ধান করতে বাধ্য হচ্ছেন|

বাংলাদেশ অংশে সুন্দরবনের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার| খুলনার কয়রা উপজেলার প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল| এছাড়া খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ২০ লাখ মানুষ মাছ, কাঁকড়া, মধু ও বনজ সম্পদ আহরণের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন|

বন বিভাগ সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে সুন্দরবনের সংরক্ষিত এলাকা ২৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫২ শতাংশ করা হয়| এতে বন সংরক্ষণে ইতিবাচক প্রভাব পড়লেও বননির্ভর মানুষের সম্পদ আহরণের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে| ফলে অনেকের আয় কমে গেছে, কেউ কেউ অবৈধভাবে বনে প্রবেশ করে আইনগত ঝুঁকিতেও পড়ছেন|

সরেজমিনে কয়রার মহেশ্বরীপুর, তেঁতুলতলার চর, মঠবাড়ি, কাশিয়াবাদ, পাথরখালী, মাটিভাঙ্গা, গিলাবাড়ি, জোড়শিং, গোলখালীসহ সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ জেলে দাদনের টাকায় সংসার চালাচ্ছেন| বন বন্ধ থাকলে আয় বন্ধ হয়ে যায়| তখন সংসার চালাতে এনজিও বা দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়| পরে মাছ বিক্রির অর্থের বড় অংশই কিস্তি ও দেনা পরিশোধে চলে যায়|

মঠবাড়ি গ্রামের বনজীবী রমেন মণ্ডল বলেন, বনের ঘাটে ঘাটে টাকা দিতে হয়| পাসের খরচ, বনদস্যুর চাঁদা, নানা খরচ দিয়ে মাছ ধরে যা পাই, তা দিয়ে সংসার চলে না| এ বছর আর বনে যাইনি| মহাজনের কাছ থেকে ধার করে চলছি|
৬ ন¤^র গ্রামের জেলে রজব আলী বলেন, সরকার যদি সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করত, তাহলে আমরা দাদনের ফাঁদ থেকে বাঁচতে পারতাম|
৬ ন¤^র কয়রা গ্রামের জেলে আবু তালেব সরদার বলেন, গত বছর মাছ ধরে ১০ হাজার টাকার বেশি লোকসান হয়েছে| বছরের অনেক সময় বনে যাওয়া বন্ধ থাকে| যে কয়দিন যাওয়া যায়, তখনও আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না| দাদনের চাপে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি|

সুন্দরবনকেন্দ্রিক উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা সেচ্ছাসেবী সংগঠন ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্টের (আইসিডি) প্রতিষ্ঠাতা মো. আশিকুজ্জামান বলেন, বনজীবীদের জন্য সরকারি উদ্যোগে বিকল্প আয়ের সুযোগ ˆতরি করা সম্ভব| সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে পরিবেশবান্ধব পর্যটন, কাঁকড়া ও মাছের চাষ, মৌচাষসহ নানা কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে| এগুলো বাস্তবায়ন হলে বনজীবীদের জীবনমান উন্নত হবে এবং সুন্দরবনের ওপর চাপও কমবে|.সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলবর্তী অঞ্চলের বনজীবী, জেলে ও বাওয়ালিদের জীবন সত্যিই চরম অনিশ্চয়তা, ঝুঁকি এবং কষ্টের প্রতীক। সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার দাকোপ, কয়রা, শ্যামনগরসহ বিভিন্ন এলাকার লাখ লাখ মানুষ জীবিকার জন্য এই বন ও নদীর ওপর নির্ভরশীল।
রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে গভীর বনে মাছ, কাঁকড়া, গোলপাতা ও মধু সংগ্রহ করতে হয়। এ সময় তাদের প্রতিনিয়ত সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার, কুমির ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর আক্রমণের আতঙ্কে থাকতে হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং লবণাক্ততার প্রকোপে তাদের জীবন ও জীবিকা বারবার বিপর্যস্ত হয়। লবণাক্ত পানি ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে সুপেয় পানির তীব্র সংকট ও চাষাবাদের জমি নষ্ট হওয়া তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।
মাছ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন মৌসুম এবং বনজ সম্পদ আহরণে নিষেধাজ্ঞার সময়গুলোতে বনজীবীদের বনে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ থাকে। ওই দীর্ঘ সময়টাতে কাজ না থাকায় অনেকেই চরম মানবিক সংকটে ও অনাহারে দিন কাটান। বনে যাওয়ার জন্য দাদন ব্যবসায়ী বা মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়। এরপর বন থেকে আহরিত সম্পদ বিক্রি করে ন্যায্য মূল্য পাওয়া সবসময় সম্ভব হয় না, ফলে সারা বছর অভাব পিছু ছাড়ে না। বনদস্যুদের চাঁদাবাজি ও অপহরণের ভয় তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। বর্তমানে বনের পরিস্থিতি অনেক অশান্ত এবং বন বিভাগের অনুমতি ও পাস-পারমিট সংগ্রহ করে বনে টিকে থাকা এখনো একটি অত্যন্ত শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়া।
খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রার অন্যতম প্রধান নদী শাকবাড়িয়ার তীরে সুন্দরবন সংলগ্ন ১৫টি গ্রাম মঠবাড়ি, কাশিয়াবাদ, কয়রা ৪ নম্বর, ৫ নম্বর, ৬ নম্বর, পাথরখালী, মাটিকাটা, গাববুনিয়া, শাকবাড়িয়া, হরিহরনগর, গাতিঘেরি, বীনাপানি, জোড়শিং, আংটিহারা ও গোলখালী। এই ১৫টি গ্রামের মানুষের বেঁচে থাকার জন্য এখনও বনের সম্পদের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে। বনজীবীরা মাছ ও কাঁকড়া ধরা, গোলপাতা কাটা ও মধু সংগ্রহ করা। বনের ভেতর ও আশপাশের নদী-খালে এরা চিংড়ি পোনাও ধরে থাকেন। জীবিকা নির্বাহে এটাও তাদের অন্যতম কাজ।
ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৭ লাখ পরিবারের জীবন ও জীবিকা এভাবেই কষ্টে কাটছে। খুলনা জেলার দাকোপ, কয়রা ও সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর, মুন্সিগঞ্জ সহ বিভিন্ন উপজেলার প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল বনজীবী। উপকূলের সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় ২০ লাখ দরিদ্র মানুষ তাদের জীবিকার জন্য পুরোপুরি অথবা আংশিকভাবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে এসব মানুষের বসবাস, যারা জীবিকার জন্য বছরের বিভিন্ন সময়ে মাছ, কাঁকড়া, গোলপাতা, মধু সংগ্রহের জন্য সুন্দরবনের গভীরে যান। তবে গত এক দশকে এসব অঞ্চলের মানুষের আয় কমছে সুন্দরবন থেকে।
বন বিভাগ তথ্য অনুযায়ী, ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটারের ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশে। সুন্দরবন রক্ষার স্বার্থে ২০১৭ সালে ২৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ৫২ শতাংশ করা হয়েছে। তাই সম্পদ আহরণ সংকীর্ণ হয়ে আসার পাশাপাশি আয় কমেছে সুন্দরবন নির্ভর জনগোষ্ঠীর। বাধ্য হয়ে পেশা বদল করেছেন, নতুন কর্মসংস্থানের খোঁজে বাস্তুচ্যুতও হয়েছেন অনেকে। অনেকে অবৈধভাবে বনে প্রবেশ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শাস্তির শিকার হয়েছেন। বন থেকে মাছ, মধু কিংবা অন্য কোনো সম্পদ বৈধভাবে আহরণ করে আগে যেখানে সচ্ছলভাবে চলত প্রতিটি পরিবার, সেখানে এখন ঋণের বোঝা নিয়ে চলতে হয় তাদের।
সুন্দরবন ঘেঁষা এলাকার অধিকাংশ পুরুষেরা মৎস্য আহরণ, গোলপাতা কাটা, কাঁকড়া ধরা আর মধু আহরণে আর নারীরা ব্যস্ত থাকেন চিংড়ির পোনা ধরায়। পরিবারের সবাই মিলে কঠিন সংগ্রাম করেও তিনবেলা ভাত জোটাতে না পেরে বনজীবীদের অনেকে আবার ফিরছে অন্য কাজে। কেউ এলাকায়, আবার কেউ দূরের শহরে। ঋণ বা দাদনের জালে অনেকটাই বন্দি হয়ে পড়েছেন উপকূলের এসকল জেলেরা। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় আয়-রোজগার থাকে না। এ কারণে সংসার চালাতে কিংবা পরিবারের সদস্যদের মুখে দু-মুঠো ভাত তুলে দিতে জেলেরা হাত পাতছেন বিভিন্ন এনজিও ও দাদন ব্যবসায়ী কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কাছে। ঋণ নিয়ে তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধান করলেও পরবর্তী সময়ে যা আয় করছেন তা দিয়ে চালাচ্ছেন দীর্ঘমেয়াদি কিস্তির টাকা দিতে গিয়ে বাড়তি কোনো টাকা আর সঞ্চয় রাখতে পারছেন না।
কয়রার মঠবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা রমেন মন্ডল, তিনি প্রায় এক যুগ ধরে সুন্দরবনের ওপর ভর করে জীবনযাপন করছেন। পাসের টাকা, অন্যান্য খরচের টাকা, বনদস্যুর টাকা, ঘুষের টাকা দিয়ে গভীরে গিয়ে যে মাছ পাওয়া যায় তা দিয়ে আসলেই কিছু হয় না। তাই এ বছর আর জঙ্গলে যাইনি। মহাজনের কাছে টাকা ধার করে সংসার চালাচ্ছি।
পাইকগাছার গড়ইখালী গ্রামের জেলে রহমত সরদার বলেন, গত বছরও মাছ ধরতে গিয়ে আমার অনেক টাকা লোকসান হয়েছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে বনে যাওয়া নিষেধ থাকে। আগের মতো নদীতে মাছ পাওয়া যায় না। আর প্রতিদিন মাছ নিয়ে আড়তে না গেলে আড়তদারদের লোকজন জেলেদের কটু কথা বলে। আড়তদার ও কোম্পানিদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী মাছ ও টাকা কেটে নিয়ে নেয়। কোন সঞ্চয় তো হয় না ঝণ করতে হয়। দাদন ব্যবসা ও মহাজনের কবলে পড়ে জেলেরা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি বৈচিত্র্যময়। পাহাড়, নদী, হাওর আর দীর্ঘ উপকূলরেখায় ঘেরা এই বদ্বীপের প্রতিবেশ ব্যবস্থা অত্যন্ত সংবেদনশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং মানুষের অনিয়ন্ত্রিত হস্তক্ষেপের মুখে পড়ে দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অঞ্চল আজ হুমকির মুখে। এই নাজুক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী দেশের মোট ১৩টি এলাকাকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ বা ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করেছে। সম্প্রতি পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নেওয়া প্রযুক্তিনির্ভর টেকসই উদ্যোগ এই এলাকাগুলোর সুরক্ষায় নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
ইসিএর পরিধি ও তালিকা : বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গুরুত্ব বিবেচনায় ঘোষিত ইসিএ তালিকাভুক্ত এলাকাগুলো হলোÑ সুন্দরবন, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, হাকালুকি হাওর, সোনাদিয়া দ্বীপ, টেকনাফ উপদ্বীপ, টাঙ্গুয়ার হাওর, মারজাত বাঁওড়, গুলশান-বারিধারা লেক, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা নদী এবং জাফলং-ডাউকি নদী। এই এলাকাগুলোকে স্পর্শকাতর বাস্তুতন্ত্র হিসেবে টিকিয়ে রাখাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
ইসিএর এলাকায় নিষিদ্ধ কার্যক্রম ও আইনি বাধ্যবাধকতা : ইসিএ এলাকায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে এমন যেকোনো কর্মকা- আইনত নিষিদ্ধ। এর মধ্যে রয়েছেÑ যেকোনো ধরনের স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ, জলাশয় ভরাট, প্রাকৃতিক বন উজাড়, বন্যপ্রাণী শিকার বা আবাসস্থল ধ্বংস, পাহাড় কাটা, বালু উত্তোলন এবং ক্ষতিকর বর্জ্য ও শিল্পকারখানার তরল বিষাক্ত পদার্থ উন্মুক্ত জলাশয়ে ফেলা। এই আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদ- বা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দ-ের বিধান রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এসব অপরাধ দমনে কঠোর নজরদারি বজায় রেখেছে।
ইসিএ এলাকা ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম : ইসিএ ব্যবস্থাপনায় সরকার একটি বিকেন্দ্রীকৃত মডেল গ্রহণ করেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের অধীনে প্রতিটি ইসিএ-তে জনগণ, স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ এবং মৎস্য অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ‘ইসিএ ব্যবস্থাপনা কমিটি’ গঠন করা হয়েছে।
জনঅংশগ্রহণ ও গ্রাম সংরক্ষণ দল : পরিবেশ অধিদপ্তর প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে স্থানীয় জনমানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কাজ করছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে হাকালুকি হাওর, কক্সবাজার-টেকনাফ সমুদ্রসৈকত, সেন্টমার্টিন দ্বীপ এবং সোনাদিয়া দ্বীপে মোট ৭৫টি ‘গ্রাম সংরক্ষণ দল’ গঠন করে সমবায় অধিদপ্তরে নিবন্ধিত করা হয়েছে। এর মধ্যে হাকালুকি হাওরে ২৮টি এবং কক্সবাজারে ৪৭টি দল সক্রিয় রয়েছে। মূলত এই দলগুলোর সদস্যদের মাধ্যমেই মাঠপর্যায়ে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
ম্যানগ্রোভ বন সৃষ্টি ও সংরক্ষণ কার্যক্রম : কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া দ্বীপ, সদর উপজেলার খুরুশকুল রাস্তারপাড়া ও নুনিয়াছড়া এবং টেকনাফ এলাকায় পরিবেশ অধিদপ্তর ম্যানগ্রোভ বন (প্যারাবন) সৃষ্টি ও সংরক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে। এই ম্যানগ্রোভ বনগুলো প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে জানমাল রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়া এই বনগুলো পরিবেশবান্ধব পর্যটনের বিকাশ, বিভিন্ন জলজ প্রাণীর নার্সারি হিসেবে কাজ করা এবং স্থানীয় ও পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
জলজ বন সৃষ্টি ও সংরক্ষণ কার্যক্রম : হাকালুকি হাওরের প্রতিবেশ ব্যবস্থা উন্নয়নে জলজ বন সৃষ্টি ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা এই হাওরের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই বন মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর নার্সারি হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমে জলজ প্রাণীর আবাসস্থল এবং শুষ্ক মৌসুমে বন্যপ্রাণী ও স্থানীয় ও পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, যা একই সাথে পরিবেশবান্ধব পর্যটন বিকাশেও সহায়ক। এছাড়া, হাওরের প্রতিবেশ ও মৎস্যসহ জলজ সম্পদ সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে বিল-খাল পুনঃখননের মাধ্যমে পনেরোটি জলাভূমির অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা হাওরের জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষা : ইসিএ-ভুক্ত নদী ও হাওর এলাকায় মাছ ও জলজ প্রাণীর নিরাপদ প্রজননের জন্য ‘অভয়াশ্রম’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অভয়াশ্রমের নির্দিষ্ট সীমানায় সারা বছর বা নির্দিষ্ট মৌসুমে মাছ ধরা ও জাল ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মৎস্যজীবীদের বিকল্প জীবিকার সুযোগ দিয়ে তাদের অভয়াশ্রম এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে হাওর ও নদীর বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির মাছের বংশবিস্তার বহুগুণ বেড়েছে।
প্রযুক্তি ও টেকসই অবকাঠামো : ইসিএর প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তর বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করেছে, যার প্রধান উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় জনবসতির জীবনমান উন্নয়ন ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ। উপকূলীয় ও হাওর অঞ্চলের সুপেয় পানির সংকট নিরসনে সৌরশক্তিচালিত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে, যা মূলত স্থানীয় জনসাধারণের জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
উপকারভোগীদের অভিজ্ঞতা ও জীবনমান : সরকারের এসব উদ্যোগের প্রত্যক্ষ সুফল পাচ্ছেন প্রান্তিক মানুষ। হাকালুকি হাওরের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, আগে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে সেচ দিতে হিমশিম খেতে হতো। এখন সৌর পাম্পের কল্যাণে কম খরচে ফসল ফলাতে পারছি।’ একইভাবে সেন্টমার্টিনের নারীরা জানান, ‘আগে লোনা বা দূষিত পানির কারণে নানা রোগব্যাধি লেগেই থাকত। এখন সৌর প্ল্যান্টের মিষ্টি পানি আমাদের অনেক সুস্থ রেখেছে।’
গ্রাম সংরক্ষণ দল ও ক্ষুদ্র মূলধন বিতরণ : ইসিএ-ভুক্ত এলাকাগুলোতে গঠিত ‘গ্রাম সংরক্ষণ দল’ বনাঞ্চল ও জলজ সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়া, এসব এলাকার মানুষদের স্বাবলম্বী করতে সহজ শর্তে ‘ইকো-লোন’ বা ক্ষুদ্র মূলধন বিতরণ করা হচ্ছে। গ্রাম সংরক্ষণ দলগুলোর মাধ্যমে নারীদের সেলাই, হাঁস-মুরগি পালন, জৈব কৃষি এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন খাতে এই মূলধন দেওয়া হচ্ছে, যা তাদের বিকল্প উপার্জনের পথ খুলে দিয়েছে।
পরিবেশ বিশ্লেষকদের মতে, সৌরশক্তি বা আধুনিক প্রযুক্তি কেবল উন্নয়নের হাতিয়ার নয়, এটি পরিবেশগত ঝুঁকি কমানোর একটি বড় উপায়। তবে তারা সতর্ক করে বলেন, সরঞ্জাম স্থাপনের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত তদারকি অপরিহার্য।
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ ড. আরমান চৌধুরী বলেন, ‘সৌরশক্তি ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ইতিবাচক হলেও তা সামগ্রিক ইকোসিস্টেম ব্যবস্থাপনার অংশ হওয়া জরুরি। শুধু সরঞ্জাম স্থাপন করলেই পরিবেশ রক্ষা হবে না; প্রযুক্তি বাস্তবায়নের সময় স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক প্রবাহের
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবন যেমন আমাদের রক্ষা করা প্রয়োজন তেমনি এত গুলো মানুষের জিবীকা নির্বাহের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। আমরা চেষ্টা করছি বনজীবীদের বিকল্প আয়ের জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা করতে। বেশ কয়েকটি প্রকল্প আমরা হাতে নিয়েছি। বনজীবীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিকল্প আয়ের জন্য যোগ্য করে তোলা হবে।
সরকারের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ ও বনজীবীদের জীবনমান উন্নয়নে উপকূলীয় উন্নয়ন সংস্থাগুলো নানা পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহম্মেদ এই প্রতিবেদককে আরো বলেন, সুন্দরবন সংরক্ষণের পাশাপাশি বননির্ভর মানুষের জীবিকার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ| বনজীবীদের বিকল্প আয়ের সুযোগ ˆতরিতে বন বিভাগ বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে| প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের বিকল্প পেশায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে|
যখন স্থানীয়ভাবে আর কোনো কাজের সুযোগ থাকে না, তখন মানুষ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নিতে বাধ্য হনÑ এলাকা ত্যাগ করা। গত দুই দশকে উপকূলীয় জেলাগুলো থেকে ঢাকামুখী মানুষের স্রোত অভাবনীয় হারে বেড়েছে। এদের বড় একটি অংশ জলবায়ু উদ্বাস্তু।
গ্রামের একজন দক্ষ কৃষক যখন ঢাকায় আসেন, তখন তার কৃষিজ্ঞান কোনো কাজে আসে না। তিনি বাধ্য হয়ে রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক বা কারখানার নি¤œবেতনের শ্রমিকে পরিণত হন। খুলনা বা চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোর বস্তিতে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, সেখানকার বাসিন্দাদের একটা বিশাল অংশ সাতক্ষীরা, দাকোপ বা কয়রা অঞ্চল থেকে আসা। লবণাক্ততা তাদের কেবল ভিটেমাটি থেকেই উচ্ছেদ করেনি, তাদের পেশাগত পরিচয় ও সামাজিক মর্যাদাটুকুও কেড়ে নিয়েছে। এই বাধ্যতামূলক অভিবাসন উপকূলের জনমিতিকেই বদলে দিচ্ছে। গ্রামে এখন কর্মক্ষম তরুণের সংখ্যা কমছে, পড়ে থাকছে কেবল বৃদ্ধ ও শিশুরা।
২০০০-২০২৫ এই পঁচিশ বছরে উপকূলের মানুষের জীবিকার ধরন যেভাবে বদলেছে, তা আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করা উচিত। অপরিকল্পিতভাবে লোনা পানি তুলে চিংড়ি চাষ এবং তার ফলে সৃষ্ট কর্মসংস্থান সংকট যদি এখনই মোকাবিলা করা না যায়, তবে এই অঞ্চলটি ভবিষ্যতে জনশূন্য লোনা মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত ও টেকসই পরিকল্পনা। প্রথমত, কৃষি গবেষণার মাধ্যমে এমন শস্য ও ফসলের জাত উদ্ভাবন করতে হবে যা উচ্চ লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে, যাতে কৃষকরা আবার তাদের মূল পেশায় ফিরতে পারেন। দ্বিতীয়ত, চিংড়ি চাষের জন্য নির্দিষ্ট জোন বা এলাকা নির্ধারণ করে দিতে হবে, যাতে ফসলি জমিতে লোনা পানি প্রবেশ না করে। তৃতীয়ত, উপকূলীয় যুবকদের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা কৃষি বা চিংড়ির বাইরেও সম্মানজনক পেশা গড়তে পারে। সর্বোপরি, সরকারের ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর আওতায় উপকূলীয় অঞ্চলে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন ও পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটাতে হবে, যা লবণাক্ততার সঙ্গে খাপ খাইয়ে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে।
লবণাক্ততা আজ উপকূলের মানুষের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু এই নিয়তির কাছে হার মানলে চলবে না। কৃষকের লাঙল হয়তো আর আগের মতো চলবে না, কিন্তু তাদের কর্মঠ হাতগুলোকে কর্মহীন রাখা যাবে না। উপকূলের মানুষের জীবিকা রক্ষা মানেই বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা।

Tag :

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

জনপ্রিয়

কর্মসংস্থানের তীব্র সংকটে সুন্দরবন উপকূলের মানুষ

প্রকাশিত সময় ১০:৫৫:৪৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬

সুন্দরবন উপকূলে গত ৩০ বছরে কমেছে ২২ শতাংশ ফসলি জমি। লবণাক্ততা বাড়ায় অনাবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে ৭ শতাংশ। নেই বিকল্প কর্মসংস্থানের বড় কোনো উদ্যোগও। এ অবস্থায় জীবিকার খোঁজে বিদেশে পাড়ি জমালেও প্রতারিত হয়ে দেশে ফিরেছেন অনেকে।
সুন্দরবন সংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বাসিন্দা হাফিজ ইসলাম। সাড়ে ৫ লাখ টাকা খরচ করে অবৈধভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে গিয়েছিলেন তিনি। এক পর্যায়ে কাজ না পেয়ে জেল খেটে আট মাস পর দেশে ফিরেছেন শূন্য হাতে।
ধারদেনা করে সৌদি আরব গিয়েছিলেন একই এলাকার মোজাহিদ। দেশটিতে গিয়ে তিন মাস না যেতেই ফিরেছেন প্রতারিত হয়ে। কাঠমিস্ত্রির কাজ করে এখন চালাচ্ছেন সংসার।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ) -এর তথ্য বলছে, লবণাক্ততায় গত ৩০ বছরে এই এলাকায় ফসলি জমি কমেছে ২২ শতাংশ। ফলে কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ায়, কর্মসংস্থানের তীব্র সংকটে এখানকার মানুষ। যাদের একটি বড় অংশ কাজের খোঁজে পাড়ি জমাচ্ছেন বিদেশে।
ওকাপ বলছে, সুন্দরবনের বাসিন্দাদের ১৬ ভাই জীবিকার জন্য বিদেশ গিয়েছেন। তবুও, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা কমাতে উপকূলীয় অঞ্চলে নেই বিকল্প কর্মসংস্থানের বড় কোনো উদ্যোগ।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের চেয়ারপার্সন শাকিরুল ইসলাম বলেন, কেউ যদি মনে করে যে আমি মাইগ্রেশন করতে চাই না তাহলে তার জন্য প্রক্রিয়া কতটা সহজ করা যায়, সেখানে যেনো সে তার পরিবার, সমাজ, সবকিছু নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে তার জন্য তার যত ধরনের অধিকার আছে, যে ধরনের সুযোগ সুবিধাগুলো সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার ইতিহাস সবসময়ই নদীর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে। কিন্তু গত দুই দশক এ জনপদের জন্য এক আমূল পরিবর্তনের অধ্যায়। এক সময় যে মানুষগুলোর পরিচয় ছিল গর্বিত কৃষক হিসেবে, যাদের গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ ছিল, আজ তারা অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে নিজেদের আদি পেশা ভুলতে বসেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে উপকূলের মাটি ও পানিতে যে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়েছে, তা কেবল পরিবেশকেই বিপন্ন করেনি; বরং উপকূলীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকার মানচিত্রে এক স্থায়ী ও বেদনাদায়ক পরিবর্তন এনেছে।
বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্তও খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও পটুয়াখালীর মতো জেলাগুলোর অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল কৃষি। দিগন্তজোড়া আমন ধানের খেত ছিল এখানকার সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু গত ২৫ বছরে এই চিত্র নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত জমির পরিমাণ জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে এই পরিবর্তন ত্বরান্বিত হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ঘূর্ণিঝড় রেমাল সেই কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে।
লবণাক্ত পানি কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ার ফলে ধানের উৎপাদন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। যে জমিতে আগে বছরে দু-তিনবার ফসল ফলত, সেখানে এখন বছরের অধিকাংশ সময় লোনা পানি থৈ থৈ করে। ফলে হাজার হাজার কৃষক তাদের বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা কৃষি পেশা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। এটি কোনো শৌখিন পেশা বদল নয়, বরং এটি হলো সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি বা টিকে থাকার কৌশল। একজন কৃষক যখন দেখেন তার চোখের সামনে সোনার ফসল নোনা পানিতে জ্বলে যাচ্ছে, তখন পেশা পরিবর্তন ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকে না।
উপকূলীয় জীবিকা পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান উদাহরণ হলো ধান চাষ ছেড়ে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষে ঝুঁকে পড়া। গত দুই দশকে এই অঞ্চলটি কার্যত চিংড়ি মহলে পরিণত হয়েছে। একে বলা হচ্ছে সাদা স্বর্ণ বা হোয়াইট গোল্ড, কিন্তু এই স্বর্ণের পেছনের গল্পটি বেশ করুণ।
কৃষি জমিতে লোনা পানি আটকে চিংড়ি চাষ করা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মনে হলেও এটি কর্মসংস্থানের ব্যাপক সংকোচন ঘটিয়েছে। কারণ, এক বিঘা জমিতে ধান চাষ করতে যে পরিমাণ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়, চিংড়ি ঘেরে তার চেয়ে অনেক কম শ্রমিকের দরকার পড়ে। ফলে কৃষিজমি যখন ঘেরে রূপান্তরিত হয়, তখন বিপুলসংখ্যক কৃষি শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন।
তা ছাড়া, এই পেশাগত পরিবর্তনে এক ধরনের শ্রেণি বৈষম্য তৈরি হয়েছে। যারা ধনী ও বড় জমির মালিক, তারা চিংড়ি চাষ করে আরও ধনী হয়েছেন। অন্যদিকে প্রান্তিক কৃষক, যার অল্প জমি ছিল, তিনি লোনা পানির কারণে চাষাবাদ করতে না পেরে নামমাত্র মূল্যে জমি ইজারা দিতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে একসময়ের স্বাধীন কৃষক আজ নিজের জমিতেই অন্যের ঘেরের পাহারাদার বা দিনমজুরে পরিণত হয়েছেন। এই পেশাগত অবনমন বা ‘ডি-ক্লাসিফিকেশন’ উপকূলীয় সমাজকাঠামোকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে।
কৃষি ও মৎস্য খাতের এই পালাবদলে যারা কাজ হারিয়েছেন, তারা কী করছেন? গত দুই দশকে উপকূলে অপ্রাতিষ্ঠানিক পেশার এক বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে, যা মূলত হতাশা থেকে জন্ম নেওয়া। কৃষিকাজ হারানো মানুষেরা এখন ভ্যান-রিকশা চালানো, ইজিবাইক চালনো, চায়ের দোকানদারি কিংবা ইটভাটায় শ্রম বিক্রির মতো পেশা বেছে নিচ্ছেন।
বিশেষ করে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বনজীবী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ মধু সংগ্রহ, গোলপাতা আহরণ কিংবা নদীতে মাছ ও কাঁকড়া ধরার কাজ করছেন। কিন্তু সেখানেও লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের থাবা। লোনা পানির কারণে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র বদলাচ্ছে, মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে যারা নদী বা বনের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতে চেয়েছিলেন, তারাও এখন অনিশ্চয়তার মুখে। ২০২৪-এর রেমাল পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, বহু মানুষ ত্রাণ নির্ভর হয়ে পড়েছেন, কারণ তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের আর কোনো সুযোগ অবশিষ্ট নেই।
লবণাক্ততা উপকূলীয় নারীদের কর্মজীবনেও বড় প্রভাব ফেলেছে। পরিবারের পুরুষ সদস্য যখন কর্মহীন হয়ে পড়েন, তখন সংসারের হাল ধরতে নারীরাও ঘরের বাইরে আসতে বাধ্য হন। গত দুই দশকে চিংড়ির পোনা ধরা বা রেণু সংগ্রহ উপকূলীয় নারীদের অন্যতম প্রধান পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোমর সমান লোনা পানিতে দাঁড়িয়ে দিনের পরদিন চিংড়ির পোনা সংগ্রহ করতে গিয়ে এই নারীরা ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন। লোনা পানির সংস্পর্শে তাদের চর্মরোগ, জরায়ু সংক্রমণ এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হচ্ছে। তবুও, অভাবের তাড়নায় তারা এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশা ছাড়তে পারছেন না। কৃষিভিত্তিক সমাজে নারীরা যেখানে বাড়ির আঙিনায় বা কৃষি কাজে সহায়তা করতেন, এখন তারা লোনা পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুন্দরবনের সংরক্ষিত এলাকা বৃদ্ধি, বনদস্যুদের উৎপাত, অসাধু দাদন ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের দৌরাত্ম্য এবং বনসম্পদ আহরণে নানা বিধিনিষেধের কারণে গত এক দশকে বননির্ভর মানুষের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে| ফলে মাছ, কাঁকড়া, মধু ও গোলপাতা সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করা পরিবারগুলোর অনেকেই এখন পেশা পরিবর্তন কিংবা এলাকা ছেড়ে অন্যত্র কাজের সন্ধান করতে বাধ্য হচ্ছেন|

বাংলাদেশ অংশে সুন্দরবনের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার| খুলনার কয়রা উপজেলার প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল| এছাড়া খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ২০ লাখ মানুষ মাছ, কাঁকড়া, মধু ও বনজ সম্পদ আহরণের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন|

বন বিভাগ সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে সুন্দরবনের সংরক্ষিত এলাকা ২৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫২ শতাংশ করা হয়| এতে বন সংরক্ষণে ইতিবাচক প্রভাব পড়লেও বননির্ভর মানুষের সম্পদ আহরণের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে| ফলে অনেকের আয় কমে গেছে, কেউ কেউ অবৈধভাবে বনে প্রবেশ করে আইনগত ঝুঁকিতেও পড়ছেন|

সরেজমিনে কয়রার মহেশ্বরীপুর, তেঁতুলতলার চর, মঠবাড়ি, কাশিয়াবাদ, পাথরখালী, মাটিভাঙ্গা, গিলাবাড়ি, জোড়শিং, গোলখালীসহ সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ জেলে দাদনের টাকায় সংসার চালাচ্ছেন| বন বন্ধ থাকলে আয় বন্ধ হয়ে যায়| তখন সংসার চালাতে এনজিও বা দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়| পরে মাছ বিক্রির অর্থের বড় অংশই কিস্তি ও দেনা পরিশোধে চলে যায়|

মঠবাড়ি গ্রামের বনজীবী রমেন মণ্ডল বলেন, বনের ঘাটে ঘাটে টাকা দিতে হয়| পাসের খরচ, বনদস্যুর চাঁদা, নানা খরচ দিয়ে মাছ ধরে যা পাই, তা দিয়ে সংসার চলে না| এ বছর আর বনে যাইনি| মহাজনের কাছ থেকে ধার করে চলছি|
৬ ন¤^র গ্রামের জেলে রজব আলী বলেন, সরকার যদি সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করত, তাহলে আমরা দাদনের ফাঁদ থেকে বাঁচতে পারতাম|
৬ ন¤^র কয়রা গ্রামের জেলে আবু তালেব সরদার বলেন, গত বছর মাছ ধরে ১০ হাজার টাকার বেশি লোকসান হয়েছে| বছরের অনেক সময় বনে যাওয়া বন্ধ থাকে| যে কয়দিন যাওয়া যায়, তখনও আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না| দাদনের চাপে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি|

সুন্দরবনকেন্দ্রিক উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা সেচ্ছাসেবী সংগঠন ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্টের (আইসিডি) প্রতিষ্ঠাতা মো. আশিকুজ্জামান বলেন, বনজীবীদের জন্য সরকারি উদ্যোগে বিকল্প আয়ের সুযোগ ˆতরি করা সম্ভব| সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে পরিবেশবান্ধব পর্যটন, কাঁকড়া ও মাছের চাষ, মৌচাষসহ নানা কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে| এগুলো বাস্তবায়ন হলে বনজীবীদের জীবনমান উন্নত হবে এবং সুন্দরবনের ওপর চাপও কমবে|.সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলবর্তী অঞ্চলের বনজীবী, জেলে ও বাওয়ালিদের জীবন সত্যিই চরম অনিশ্চয়তা, ঝুঁকি এবং কষ্টের প্রতীক। সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার দাকোপ, কয়রা, শ্যামনগরসহ বিভিন্ন এলাকার লাখ লাখ মানুষ জীবিকার জন্য এই বন ও নদীর ওপর নির্ভরশীল।
রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে গভীর বনে মাছ, কাঁকড়া, গোলপাতা ও মধু সংগ্রহ করতে হয়। এ সময় তাদের প্রতিনিয়ত সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার, কুমির ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর আক্রমণের আতঙ্কে থাকতে হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং লবণাক্ততার প্রকোপে তাদের জীবন ও জীবিকা বারবার বিপর্যস্ত হয়। লবণাক্ত পানি ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে সুপেয় পানির তীব্র সংকট ও চাষাবাদের জমি নষ্ট হওয়া তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।
মাছ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন মৌসুম এবং বনজ সম্পদ আহরণে নিষেধাজ্ঞার সময়গুলোতে বনজীবীদের বনে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ থাকে। ওই দীর্ঘ সময়টাতে কাজ না থাকায় অনেকেই চরম মানবিক সংকটে ও অনাহারে দিন কাটান। বনে যাওয়ার জন্য দাদন ব্যবসায়ী বা মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়। এরপর বন থেকে আহরিত সম্পদ বিক্রি করে ন্যায্য মূল্য পাওয়া সবসময় সম্ভব হয় না, ফলে সারা বছর অভাব পিছু ছাড়ে না। বনদস্যুদের চাঁদাবাজি ও অপহরণের ভয় তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। বর্তমানে বনের পরিস্থিতি অনেক অশান্ত এবং বন বিভাগের অনুমতি ও পাস-পারমিট সংগ্রহ করে বনে টিকে থাকা এখনো একটি অত্যন্ত শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়া।
খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রার অন্যতম প্রধান নদী শাকবাড়িয়ার তীরে সুন্দরবন সংলগ্ন ১৫টি গ্রাম মঠবাড়ি, কাশিয়াবাদ, কয়রা ৪ নম্বর, ৫ নম্বর, ৬ নম্বর, পাথরখালী, মাটিকাটা, গাববুনিয়া, শাকবাড়িয়া, হরিহরনগর, গাতিঘেরি, বীনাপানি, জোড়শিং, আংটিহারা ও গোলখালী। এই ১৫টি গ্রামের মানুষের বেঁচে থাকার জন্য এখনও বনের সম্পদের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে। বনজীবীরা মাছ ও কাঁকড়া ধরা, গোলপাতা কাটা ও মধু সংগ্রহ করা। বনের ভেতর ও আশপাশের নদী-খালে এরা চিংড়ি পোনাও ধরে থাকেন। জীবিকা নির্বাহে এটাও তাদের অন্যতম কাজ।
ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৭ লাখ পরিবারের জীবন ও জীবিকা এভাবেই কষ্টে কাটছে। খুলনা জেলার দাকোপ, কয়রা ও সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর, মুন্সিগঞ্জ সহ বিভিন্ন উপজেলার প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল বনজীবী। উপকূলের সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় ২০ লাখ দরিদ্র মানুষ তাদের জীবিকার জন্য পুরোপুরি অথবা আংশিকভাবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে এসব মানুষের বসবাস, যারা জীবিকার জন্য বছরের বিভিন্ন সময়ে মাছ, কাঁকড়া, গোলপাতা, মধু সংগ্রহের জন্য সুন্দরবনের গভীরে যান। তবে গত এক দশকে এসব অঞ্চলের মানুষের আয় কমছে সুন্দরবন থেকে।
বন বিভাগ তথ্য অনুযায়ী, ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটারের ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশে। সুন্দরবন রক্ষার স্বার্থে ২০১৭ সালে ২৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ৫২ শতাংশ করা হয়েছে। তাই সম্পদ আহরণ সংকীর্ণ হয়ে আসার পাশাপাশি আয় কমেছে সুন্দরবন নির্ভর জনগোষ্ঠীর। বাধ্য হয়ে পেশা বদল করেছেন, নতুন কর্মসংস্থানের খোঁজে বাস্তুচ্যুতও হয়েছেন অনেকে। অনেকে অবৈধভাবে বনে প্রবেশ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শাস্তির শিকার হয়েছেন। বন থেকে মাছ, মধু কিংবা অন্য কোনো সম্পদ বৈধভাবে আহরণ করে আগে যেখানে সচ্ছলভাবে চলত প্রতিটি পরিবার, সেখানে এখন ঋণের বোঝা নিয়ে চলতে হয় তাদের।
সুন্দরবন ঘেঁষা এলাকার অধিকাংশ পুরুষেরা মৎস্য আহরণ, গোলপাতা কাটা, কাঁকড়া ধরা আর মধু আহরণে আর নারীরা ব্যস্ত থাকেন চিংড়ির পোনা ধরায়। পরিবারের সবাই মিলে কঠিন সংগ্রাম করেও তিনবেলা ভাত জোটাতে না পেরে বনজীবীদের অনেকে আবার ফিরছে অন্য কাজে। কেউ এলাকায়, আবার কেউ দূরের শহরে। ঋণ বা দাদনের জালে অনেকটাই বন্দি হয়ে পড়েছেন উপকূলের এসকল জেলেরা। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় আয়-রোজগার থাকে না। এ কারণে সংসার চালাতে কিংবা পরিবারের সদস্যদের মুখে দু-মুঠো ভাত তুলে দিতে জেলেরা হাত পাতছেন বিভিন্ন এনজিও ও দাদন ব্যবসায়ী কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কাছে। ঋণ নিয়ে তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধান করলেও পরবর্তী সময়ে যা আয় করছেন তা দিয়ে চালাচ্ছেন দীর্ঘমেয়াদি কিস্তির টাকা দিতে গিয়ে বাড়তি কোনো টাকা আর সঞ্চয় রাখতে পারছেন না।
কয়রার মঠবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা রমেন মন্ডল, তিনি প্রায় এক যুগ ধরে সুন্দরবনের ওপর ভর করে জীবনযাপন করছেন। পাসের টাকা, অন্যান্য খরচের টাকা, বনদস্যুর টাকা, ঘুষের টাকা দিয়ে গভীরে গিয়ে যে মাছ পাওয়া যায় তা দিয়ে আসলেই কিছু হয় না। তাই এ বছর আর জঙ্গলে যাইনি। মহাজনের কাছে টাকা ধার করে সংসার চালাচ্ছি।
পাইকগাছার গড়ইখালী গ্রামের জেলে রহমত সরদার বলেন, গত বছরও মাছ ধরতে গিয়ে আমার অনেক টাকা লোকসান হয়েছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে বনে যাওয়া নিষেধ থাকে। আগের মতো নদীতে মাছ পাওয়া যায় না। আর প্রতিদিন মাছ নিয়ে আড়তে না গেলে আড়তদারদের লোকজন জেলেদের কটু কথা বলে। আড়তদার ও কোম্পানিদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী মাছ ও টাকা কেটে নিয়ে নেয়। কোন সঞ্চয় তো হয় না ঝণ করতে হয়। দাদন ব্যবসা ও মহাজনের কবলে পড়ে জেলেরা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি বৈচিত্র্যময়। পাহাড়, নদী, হাওর আর দীর্ঘ উপকূলরেখায় ঘেরা এই বদ্বীপের প্রতিবেশ ব্যবস্থা অত্যন্ত সংবেদনশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং মানুষের অনিয়ন্ত্রিত হস্তক্ষেপের মুখে পড়ে দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অঞ্চল আজ হুমকির মুখে। এই নাজুক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী দেশের মোট ১৩টি এলাকাকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ বা ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করেছে। সম্প্রতি পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নেওয়া প্রযুক্তিনির্ভর টেকসই উদ্যোগ এই এলাকাগুলোর সুরক্ষায় নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
ইসিএর পরিধি ও তালিকা : বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গুরুত্ব বিবেচনায় ঘোষিত ইসিএ তালিকাভুক্ত এলাকাগুলো হলোÑ সুন্দরবন, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, হাকালুকি হাওর, সোনাদিয়া দ্বীপ, টেকনাফ উপদ্বীপ, টাঙ্গুয়ার হাওর, মারজাত বাঁওড়, গুলশান-বারিধারা লেক, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা নদী এবং জাফলং-ডাউকি নদী। এই এলাকাগুলোকে স্পর্শকাতর বাস্তুতন্ত্র হিসেবে টিকিয়ে রাখাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
ইসিএর এলাকায় নিষিদ্ধ কার্যক্রম ও আইনি বাধ্যবাধকতা : ইসিএ এলাকায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে এমন যেকোনো কর্মকা- আইনত নিষিদ্ধ। এর মধ্যে রয়েছেÑ যেকোনো ধরনের স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ, জলাশয় ভরাট, প্রাকৃতিক বন উজাড়, বন্যপ্রাণী শিকার বা আবাসস্থল ধ্বংস, পাহাড় কাটা, বালু উত্তোলন এবং ক্ষতিকর বর্জ্য ও শিল্পকারখানার তরল বিষাক্ত পদার্থ উন্মুক্ত জলাশয়ে ফেলা। এই আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদ- বা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দ-ের বিধান রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এসব অপরাধ দমনে কঠোর নজরদারি বজায় রেখেছে।
ইসিএ এলাকা ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম : ইসিএ ব্যবস্থাপনায় সরকার একটি বিকেন্দ্রীকৃত মডেল গ্রহণ করেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের অধীনে প্রতিটি ইসিএ-তে জনগণ, স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ এবং মৎস্য অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ‘ইসিএ ব্যবস্থাপনা কমিটি’ গঠন করা হয়েছে।
জনঅংশগ্রহণ ও গ্রাম সংরক্ষণ দল : পরিবেশ অধিদপ্তর প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে স্থানীয় জনমানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কাজ করছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে হাকালুকি হাওর, কক্সবাজার-টেকনাফ সমুদ্রসৈকত, সেন্টমার্টিন দ্বীপ এবং সোনাদিয়া দ্বীপে মোট ৭৫টি ‘গ্রাম সংরক্ষণ দল’ গঠন করে সমবায় অধিদপ্তরে নিবন্ধিত করা হয়েছে। এর মধ্যে হাকালুকি হাওরে ২৮টি এবং কক্সবাজারে ৪৭টি দল সক্রিয় রয়েছে। মূলত এই দলগুলোর সদস্যদের মাধ্যমেই মাঠপর্যায়ে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
ম্যানগ্রোভ বন সৃষ্টি ও সংরক্ষণ কার্যক্রম : কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া দ্বীপ, সদর উপজেলার খুরুশকুল রাস্তারপাড়া ও নুনিয়াছড়া এবং টেকনাফ এলাকায় পরিবেশ অধিদপ্তর ম্যানগ্রোভ বন (প্যারাবন) সৃষ্টি ও সংরক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে। এই ম্যানগ্রোভ বনগুলো প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে জানমাল রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়া এই বনগুলো পরিবেশবান্ধব পর্যটনের বিকাশ, বিভিন্ন জলজ প্রাণীর নার্সারি হিসেবে কাজ করা এবং স্থানীয় ও পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
জলজ বন সৃষ্টি ও সংরক্ষণ কার্যক্রম : হাকালুকি হাওরের প্রতিবেশ ব্যবস্থা উন্নয়নে জলজ বন সৃষ্টি ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা এই হাওরের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই বন মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর নার্সারি হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমে জলজ প্রাণীর আবাসস্থল এবং শুষ্ক মৌসুমে বন্যপ্রাণী ও স্থানীয় ও পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, যা একই সাথে পরিবেশবান্ধব পর্যটন বিকাশেও সহায়ক। এছাড়া, হাওরের প্রতিবেশ ও মৎস্যসহ জলজ সম্পদ সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে বিল-খাল পুনঃখননের মাধ্যমে পনেরোটি জলাভূমির অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা হাওরের জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষা : ইসিএ-ভুক্ত নদী ও হাওর এলাকায় মাছ ও জলজ প্রাণীর নিরাপদ প্রজননের জন্য ‘অভয়াশ্রম’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অভয়াশ্রমের নির্দিষ্ট সীমানায় সারা বছর বা নির্দিষ্ট মৌসুমে মাছ ধরা ও জাল ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মৎস্যজীবীদের বিকল্প জীবিকার সুযোগ দিয়ে তাদের অভয়াশ্রম এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে হাওর ও নদীর বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির মাছের বংশবিস্তার বহুগুণ বেড়েছে।
প্রযুক্তি ও টেকসই অবকাঠামো : ইসিএর প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তর বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করেছে, যার প্রধান উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় জনবসতির জীবনমান উন্নয়ন ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ। উপকূলীয় ও হাওর অঞ্চলের সুপেয় পানির সংকট নিরসনে সৌরশক্তিচালিত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে, যা মূলত স্থানীয় জনসাধারণের জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
উপকারভোগীদের অভিজ্ঞতা ও জীবনমান : সরকারের এসব উদ্যোগের প্রত্যক্ষ সুফল পাচ্ছেন প্রান্তিক মানুষ। হাকালুকি হাওরের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, আগে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে সেচ দিতে হিমশিম খেতে হতো। এখন সৌর পাম্পের কল্যাণে কম খরচে ফসল ফলাতে পারছি।’ একইভাবে সেন্টমার্টিনের নারীরা জানান, ‘আগে লোনা বা দূষিত পানির কারণে নানা রোগব্যাধি লেগেই থাকত। এখন সৌর প্ল্যান্টের মিষ্টি পানি আমাদের অনেক সুস্থ রেখেছে।’
গ্রাম সংরক্ষণ দল ও ক্ষুদ্র মূলধন বিতরণ : ইসিএ-ভুক্ত এলাকাগুলোতে গঠিত ‘গ্রাম সংরক্ষণ দল’ বনাঞ্চল ও জলজ সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়া, এসব এলাকার মানুষদের স্বাবলম্বী করতে সহজ শর্তে ‘ইকো-লোন’ বা ক্ষুদ্র মূলধন বিতরণ করা হচ্ছে। গ্রাম সংরক্ষণ দলগুলোর মাধ্যমে নারীদের সেলাই, হাঁস-মুরগি পালন, জৈব কৃষি এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন খাতে এই মূলধন দেওয়া হচ্ছে, যা তাদের বিকল্প উপার্জনের পথ খুলে দিয়েছে।
পরিবেশ বিশ্লেষকদের মতে, সৌরশক্তি বা আধুনিক প্রযুক্তি কেবল উন্নয়নের হাতিয়ার নয়, এটি পরিবেশগত ঝুঁকি কমানোর একটি বড় উপায়। তবে তারা সতর্ক করে বলেন, সরঞ্জাম স্থাপনের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত তদারকি অপরিহার্য।
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ ড. আরমান চৌধুরী বলেন, ‘সৌরশক্তি ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ইতিবাচক হলেও তা সামগ্রিক ইকোসিস্টেম ব্যবস্থাপনার অংশ হওয়া জরুরি। শুধু সরঞ্জাম স্থাপন করলেই পরিবেশ রক্ষা হবে না; প্রযুক্তি বাস্তবায়নের সময় স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক প্রবাহের
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবন যেমন আমাদের রক্ষা করা প্রয়োজন তেমনি এত গুলো মানুষের জিবীকা নির্বাহের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। আমরা চেষ্টা করছি বনজীবীদের বিকল্প আয়ের জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা করতে। বেশ কয়েকটি প্রকল্প আমরা হাতে নিয়েছি। বনজীবীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিকল্প আয়ের জন্য যোগ্য করে তোলা হবে।
সরকারের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ ও বনজীবীদের জীবনমান উন্নয়নে উপকূলীয় উন্নয়ন সংস্থাগুলো নানা পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহম্মেদ এই প্রতিবেদককে আরো বলেন, সুন্দরবন সংরক্ষণের পাশাপাশি বননির্ভর মানুষের জীবিকার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ| বনজীবীদের বিকল্প আয়ের সুযোগ ˆতরিতে বন বিভাগ বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে| প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের বিকল্প পেশায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে|
যখন স্থানীয়ভাবে আর কোনো কাজের সুযোগ থাকে না, তখন মানুষ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নিতে বাধ্য হনÑ এলাকা ত্যাগ করা। গত দুই দশকে উপকূলীয় জেলাগুলো থেকে ঢাকামুখী মানুষের স্রোত অভাবনীয় হারে বেড়েছে। এদের বড় একটি অংশ জলবায়ু উদ্বাস্তু।
গ্রামের একজন দক্ষ কৃষক যখন ঢাকায় আসেন, তখন তার কৃষিজ্ঞান কোনো কাজে আসে না। তিনি বাধ্য হয়ে রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক বা কারখানার নি¤œবেতনের শ্রমিকে পরিণত হন। খুলনা বা চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোর বস্তিতে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, সেখানকার বাসিন্দাদের একটা বিশাল অংশ সাতক্ষীরা, দাকোপ বা কয়রা অঞ্চল থেকে আসা। লবণাক্ততা তাদের কেবল ভিটেমাটি থেকেই উচ্ছেদ করেনি, তাদের পেশাগত পরিচয় ও সামাজিক মর্যাদাটুকুও কেড়ে নিয়েছে। এই বাধ্যতামূলক অভিবাসন উপকূলের জনমিতিকেই বদলে দিচ্ছে। গ্রামে এখন কর্মক্ষম তরুণের সংখ্যা কমছে, পড়ে থাকছে কেবল বৃদ্ধ ও শিশুরা।
২০০০-২০২৫ এই পঁচিশ বছরে উপকূলের মানুষের জীবিকার ধরন যেভাবে বদলেছে, তা আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করা উচিত। অপরিকল্পিতভাবে লোনা পানি তুলে চিংড়ি চাষ এবং তার ফলে সৃষ্ট কর্মসংস্থান সংকট যদি এখনই মোকাবিলা করা না যায়, তবে এই অঞ্চলটি ভবিষ্যতে জনশূন্য লোনা মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত ও টেকসই পরিকল্পনা। প্রথমত, কৃষি গবেষণার মাধ্যমে এমন শস্য ও ফসলের জাত উদ্ভাবন করতে হবে যা উচ্চ লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে, যাতে কৃষকরা আবার তাদের মূল পেশায় ফিরতে পারেন। দ্বিতীয়ত, চিংড়ি চাষের জন্য নির্দিষ্ট জোন বা এলাকা নির্ধারণ করে দিতে হবে, যাতে ফসলি জমিতে লোনা পানি প্রবেশ না করে। তৃতীয়ত, উপকূলীয় যুবকদের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা কৃষি বা চিংড়ির বাইরেও সম্মানজনক পেশা গড়তে পারে। সর্বোপরি, সরকারের ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর আওতায় উপকূলীয় অঞ্চলে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন ও পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটাতে হবে, যা লবণাক্ততার সঙ্গে খাপ খাইয়ে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে।
লবণাক্ততা আজ উপকূলের মানুষের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু এই নিয়তির কাছে হার মানলে চলবে না। কৃষকের লাঙল হয়তো আর আগের মতো চলবে না, কিন্তু তাদের কর্মঠ হাতগুলোকে কর্মহীন রাখা যাবে না। উপকূলের মানুষের জীবিকা রক্ষা মানেই বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা।