ঢাকা ০২:০৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইজিবাইকচালক বাবার ঘামে মেয়ের জিপিএ-৫, ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন জয়িতার

সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী। পরিবারের আয়ের প্রধান ভরসা বাবার ইজিবাইক। সারাদিন ইজিবাইক চালিয়ে যে আয়, তা দিয়েই কোনো রকমে চলে সংসার। সেই সীমিত আয়ের মধ্যেই দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাতে হয়েছে। বই-খাতা, কোচিং কিংবা পরীক্ষার ফি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল আর্থিক টানাপোড়েন। কখনো কখনো অর্থের অভাবে পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রমও হয়েছে। কিন্তু দারিদ্র্য আর প্রতিকূলতা থামাতে পারেনি জয়িতা হালদারকে। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে সে এখন স্বপ্ন দেখছে ডাক্তার হওয়ার।

খুলনার পাইকগাছা উপজেলার পূর্ব খড়িয়া গ্রামের পূর্ণ হালদারের মেয়ে জয়িতা হালদার। দুই ভাই-বোনের মধ্যে জয়িতা ছোট। তার বাবা পূর্ণ হালদার পেশায় একজন ইজিবাইকচালক। বাবার ইজিবাইক চালিয়ে উপার্জিত অর্থেই চলে পরিবারের সংসার ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ।

এমন একটি পরিবারের সন্তান হয়েও জয়িতা পড়াশোনায় হাল ছাড়েনি। খড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে। তার এই সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে।

জয়িতার পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। বাবার ইজিবাইক চালানোর আয় দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি মেয়ের পড়াশোনার খরচ বহন করতে হয়েছে। ফলে বই-খাতা কেনা, কোচিং ও পরীক্ষার ফি দেওয়ার সময় প্রায়ই আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছে।

অর্থের অভাবে কয়েকবার জয়িতার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে কখনো কখনো তার মনেও এসেছে, হয়তো পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু বাবা-মায়ের কষ্ট তাকে সেই সিদ্ধান্ত নিতে দেয়নি। সংসারের কাজে বাবা-মাকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি অবসর সময়টুকু কাজে লাগিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে গেছে সে।

পরীক্ষার আগে আরও বেশি মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করেছে জয়িতা। নিজের ভবিষ্যৎ সুন্দর করার ইচ্ছার পাশাপাশি বাবা-মায়ের কষ্টই ছিল তার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। নিজেদের প্রয়োজন কমিয়ে বাবা-মা তার পড়াশোনার খরচ বহন করেছেন—এই ত্যাগকেই নিজের সাফল্যের মাধ্যমে সার্থক করতে চেয়েছে সে।

জয়িতার সংগ্রামের গল্পে বিদ্যালয়ের সহযোগিতার ঘটনাটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সময়ও আর্থিক সংকটে পড়েছিল পরিবারটি। তখন বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা একটি ফান্ড থেকে জয়িতার ফরম পূরণের টাকা দেওয়া হয়।

খড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা ছবি রানী হালদার জানান, তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। পরে প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা মিলে একটি ফান্ড তৈরি করেন। সেই ফান্ডের টাকা থেকেই জয়িতার এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের খরচ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, জয়িতার পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না হলেও মেয়েটি পড়াশোনার প্রতি অত্যন্ত মনোযোগী ছিল। অর্থের অভাবে যাতে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর পড়াশোনা থেমে না যায়, সে জন্য বিদ্যালয় ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। জয়িতার জিপিএ-৫ অর্জনে তারা আনন্দিত ও গর্বিত।

২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন জয়িতার কাছে শুধু একটি ফলাফল নয়—এটি দীর্ঘদিনের সংগ্রামের স্বীকৃতি। যে পরিবারের জন্য পড়াশোনার খরচ জোগাড় করাই ছিল কঠিন, সেই পরিবারের মেয়েই আজ উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছে।

জয়িতার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ডাক্তার হওয়া। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে একজন চিকিৎসক হয়ে শুধু নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে নয়, পরিবারের দীর্ঘদিনের আর্থিক কষ্টও দূর করতে চায় সে।

জয়িতা হালদার বলে, “বাবা-মায়ের কষ্ট আমাকে সবসময় অনুপ্রেরণা দিয়েছে। অর্থের অভাবে কখনো কখনো পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথা মনে হলেও শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে গেছি। ভবিষ্যতে ভালোভাবে পড়াশোনা করে ডাক্তার হতে চাই এবং আমার পরিবারের আর্থিক কষ্ট দূর করতে চাই।”

তার পরামর্শ, অর্থের অভাব থাকলেও অন্য শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। চেষ্টা, পরিশ্রম ও ধৈর্য ধরে এগিয়ে গেলে সাফল্য একদিন আসবেই।

জয়িতার হাতে এখন ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার জিপিএ-৫। কিন্তু এই ফলাফলের পেছনে আছে একজন ইজিবাইকচালক বাবার ঘাম, মায়ের ত্যাগ, সন্তানের স্বপ্ন এবং শিক্ষকদের সহযোগিতা। কখনো বই-খাতার টাকা জোগাড় করতে হয়েছে কষ্ট করে, কখনো পরীক্ষার ফরম পূরণের টাকাও এসেছে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের ফান্ড থেকে। তারপরও থেমে থাকেনি জয়িতা।

অভাব তার পথ কঠিন করেছে, কিন্তু স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারেনি। জিপিএ-৫ দিয়ে প্রথম ধাপ পেরিয়েছে জয়িতা। এখন তার সামনে উচ্চশিক্ষার দীর্ঘ পথ—আর সেই পথের শেষ প্রান্তে সে দেখতে চায় সাদা অ্যাপ্রন পরা একজন চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে। তার সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তব হবে, তা নির্ভর করবে তার মেধা-পরিশ্রমের পাশাপাশি আগামী দিনের সহযোগিতা ও সুযোগের ওপর।

Tag :

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

জনপ্রিয়

ইজিবাইকচালক বাবার ঘামে মেয়ের জিপিএ-৫, ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন জয়িতার

প্রকাশিত সময় ০৭:০৯:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী। পরিবারের আয়ের প্রধান ভরসা বাবার ইজিবাইক। সারাদিন ইজিবাইক চালিয়ে যে আয়, তা দিয়েই কোনো রকমে চলে সংসার। সেই সীমিত আয়ের মধ্যেই দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাতে হয়েছে। বই-খাতা, কোচিং কিংবা পরীক্ষার ফি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল আর্থিক টানাপোড়েন। কখনো কখনো অর্থের অভাবে পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রমও হয়েছে। কিন্তু দারিদ্র্য আর প্রতিকূলতা থামাতে পারেনি জয়িতা হালদারকে। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে সে এখন স্বপ্ন দেখছে ডাক্তার হওয়ার।

খুলনার পাইকগাছা উপজেলার পূর্ব খড়িয়া গ্রামের পূর্ণ হালদারের মেয়ে জয়িতা হালদার। দুই ভাই-বোনের মধ্যে জয়িতা ছোট। তার বাবা পূর্ণ হালদার পেশায় একজন ইজিবাইকচালক। বাবার ইজিবাইক চালিয়ে উপার্জিত অর্থেই চলে পরিবারের সংসার ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ।

এমন একটি পরিবারের সন্তান হয়েও জয়িতা পড়াশোনায় হাল ছাড়েনি। খড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে। তার এই সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে।

জয়িতার পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। বাবার ইজিবাইক চালানোর আয় দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি মেয়ের পড়াশোনার খরচ বহন করতে হয়েছে। ফলে বই-খাতা কেনা, কোচিং ও পরীক্ষার ফি দেওয়ার সময় প্রায়ই আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছে।

অর্থের অভাবে কয়েকবার জয়িতার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে কখনো কখনো তার মনেও এসেছে, হয়তো পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু বাবা-মায়ের কষ্ট তাকে সেই সিদ্ধান্ত নিতে দেয়নি। সংসারের কাজে বাবা-মাকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি অবসর সময়টুকু কাজে লাগিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে গেছে সে।

পরীক্ষার আগে আরও বেশি মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করেছে জয়িতা। নিজের ভবিষ্যৎ সুন্দর করার ইচ্ছার পাশাপাশি বাবা-মায়ের কষ্টই ছিল তার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। নিজেদের প্রয়োজন কমিয়ে বাবা-মা তার পড়াশোনার খরচ বহন করেছেন—এই ত্যাগকেই নিজের সাফল্যের মাধ্যমে সার্থক করতে চেয়েছে সে।

জয়িতার সংগ্রামের গল্পে বিদ্যালয়ের সহযোগিতার ঘটনাটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সময়ও আর্থিক সংকটে পড়েছিল পরিবারটি। তখন বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা একটি ফান্ড থেকে জয়িতার ফরম পূরণের টাকা দেওয়া হয়।

খড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা ছবি রানী হালদার জানান, তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। পরে প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা মিলে একটি ফান্ড তৈরি করেন। সেই ফান্ডের টাকা থেকেই জয়িতার এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের খরচ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, জয়িতার পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না হলেও মেয়েটি পড়াশোনার প্রতি অত্যন্ত মনোযোগী ছিল। অর্থের অভাবে যাতে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর পড়াশোনা থেমে না যায়, সে জন্য বিদ্যালয় ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। জয়িতার জিপিএ-৫ অর্জনে তারা আনন্দিত ও গর্বিত।

২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন জয়িতার কাছে শুধু একটি ফলাফল নয়—এটি দীর্ঘদিনের সংগ্রামের স্বীকৃতি। যে পরিবারের জন্য পড়াশোনার খরচ জোগাড় করাই ছিল কঠিন, সেই পরিবারের মেয়েই আজ উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছে।

জয়িতার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ডাক্তার হওয়া। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে একজন চিকিৎসক হয়ে শুধু নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে নয়, পরিবারের দীর্ঘদিনের আর্থিক কষ্টও দূর করতে চায় সে।

জয়িতা হালদার বলে, “বাবা-মায়ের কষ্ট আমাকে সবসময় অনুপ্রেরণা দিয়েছে। অর্থের অভাবে কখনো কখনো পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথা মনে হলেও শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে গেছি। ভবিষ্যতে ভালোভাবে পড়াশোনা করে ডাক্তার হতে চাই এবং আমার পরিবারের আর্থিক কষ্ট দূর করতে চাই।”

তার পরামর্শ, অর্থের অভাব থাকলেও অন্য শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। চেষ্টা, পরিশ্রম ও ধৈর্য ধরে এগিয়ে গেলে সাফল্য একদিন আসবেই।

জয়িতার হাতে এখন ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার জিপিএ-৫। কিন্তু এই ফলাফলের পেছনে আছে একজন ইজিবাইকচালক বাবার ঘাম, মায়ের ত্যাগ, সন্তানের স্বপ্ন এবং শিক্ষকদের সহযোগিতা। কখনো বই-খাতার টাকা জোগাড় করতে হয়েছে কষ্ট করে, কখনো পরীক্ষার ফরম পূরণের টাকাও এসেছে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের ফান্ড থেকে। তারপরও থেমে থাকেনি জয়িতা।

অভাব তার পথ কঠিন করেছে, কিন্তু স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারেনি। জিপিএ-৫ দিয়ে প্রথম ধাপ পেরিয়েছে জয়িতা। এখন তার সামনে উচ্চশিক্ষার দীর্ঘ পথ—আর সেই পথের শেষ প্রান্তে সে দেখতে চায় সাদা অ্যাপ্রন পরা একজন চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে। তার সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তব হবে, তা নির্ভর করবে তার মেধা-পরিশ্রমের পাশাপাশি আগামী দিনের সহযোগিতা ও সুযোগের ওপর।