পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলা সদরের সূর্য সন্তান কোটা বিরোধী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত জিহাদ হোসেনকে (২৫) হারিয়ে পরিবারের সদস্যরা এখনও বাকরুদ্ধ| দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শহীদ জিহাদের রক্তমাখা জামাটাই বাবা-মার কাছে শুধু স্মৃতি হয়ে আছে| বাঁধ ভাঙা অশ্রুর জোয়ারে আজও ভাসছে তাদের চোখ| ছেলের ছবি বুকে চেপে মা অনবরত কেঁদেই চলছেন| পাগলপ্রায় বাবা| ছোট ভাইকে হারিয়ে আর্তনাদ করছেন বড় এক ভাই ও দুই বোন| জিহাদ উপজেলা সদরের মোল্লাপট্টি এলাকার নুরুল আমিন মোল্লা (৫৯) ও শাহিনুর বেগম (৫৪) দম্পতির ছেলে| দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট ছিলেন| ঢাকার যাত্রাবাড়ির কোনাপাড়া এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থেকে সরকারি কবি নজরুল কলেজে ইতিহাস বিভাগে মার্স্টাসে অধ্যয়নরত ছিলেন|
উপজেলা সদরের মোল্লা পরিবারের সন্তান শহীদ জিহাদের মা শাহিনুর বেগম তার আদরের ছোট ছেলেকে হারিয়ে এখনও পাগল প্রায়| প্রিয় সন্তানের ছবি বুকে জড়িয়ে অসহায়ের মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে চিৎকার করে বারবার বলছেন “বাবা জিহাদ, মৃত্যুর সময় তুমি কেমন করছিলা! আমাকে মা মা করে ডাকছিলা! বাবাগো আমিতো বাড়িতে ছিলাম| তোমার ডাকে সাড়া দিতে পারি নাই|” জিহাদকে হারিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তার বাবা নুরুল আমিন মোল্লা| শোকে বাকরুদ্ধ বড় ভাই জিন্নাত হোসেন (৩১) এবং দুই বোন জান্নাতুল (৩৬) ও জয়নব (৩২)| তাকে ঘিরে অনেক ¯^প্ন ছিল পরিবারের সকলের| তার এমন অকাল মৃত্যুতে পরিবারটির মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে| শোকের ছায়া ¯^জন ও প্রতিবেশীদের চোখে মুখে| প্রত্যক্ষদর্শী সহপাঠী বন্ধু, স্থানীয় ও পারিবারিক সুত্রে জানা যায়, বিগত ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩ টার দিকে কোটা বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ি এলাকায় দনিয়া কলেজ ও কাজলা ফুটওভার ব্রীজের মাঝামাঝি রাস্তায় জিহাদ বুকের ডান পাঁজরে গুলিবিদ্ধ হন| গুরুতর আহত অবস্থায় সহপাঠী ও বন্ধুরা তাকে উদ্ধার করে এলাকার সালমান হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আশংকাজনক অবস্থায় দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করেন| সেখানে ভর্তির কিছুক্ষণ পর বিকেল পৌণে ৫টার দিকে চিকিৎসারত অবস্থায় মৃত্যু হয়| ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে ময়না তদন্ত শেষে ২০ জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে এ্যা¤^ুলেন্সযোগে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকায় আবৃত কফিনে জিহাদের মরদেহ উপজেলা সদরের মোল্লা বাড়ির নিজ বাসভবনের সামনে এসে পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারনা হয়| আত্নীয় ¯^জন, প্রতিবেশি, বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনদের কান্না ও বুকফাঁটা আর্তনাদে এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠে | এই সময়ে পরিস্থিতি ¯^াভাবিক রাখতে দু’জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং থানার ওসিসহ বিপুল সংখ্যক পুলিশের উপস্থিতি ছিল| পরে ২১ জুলাই ভোরে দশমিনা সদর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় চত্বরে জিহাদের জানাজার নামাজ শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়| জিহাদ স্থানীয় দশমিনা সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১৬ সালে বিজ্ঞান বিভাগে এস.এস.সি ও ঢাকার ওয়ারী এলাকায় স্যার সলিমুল্লাহ কলেজ থেকে ২০১৮ সালে এইচ.এস.সি শেষ করে সরকারি কবি নজরুল কলেজ থেকে ইতিহাসে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রী অর্জন করেন এবং একই কলেজে ঐ বিষয়ে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হন| কান্না জড়িত কন্ঠে জিহাদের বাবা নুরুল আমিন মোল্লা বলেন, আমার ছেলে জিহাদ মেধাবী ছাত্র ছিল| কেমনে কি হয়ে গেলো জানি না| আমার ছেলেকে যারা খুন করেছে আমি তাদের বিচারের দাবী জানাই| মা শাহিনুর বেগম বলেন, আমার মতো আর কোনো মায়ের বুক যেনো এভাবে খালি না হয়| বড় বোন জান্নাতুল বলেন,দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের তথা দেশবাসীর অধিকার আদায় করতে গিয়ে আমার ছোট ভাই জীবন উৎসর্গ করেছে|
বড় ভাই জিন্নাত হোসেন দৈনিক সংবাদ প্রতিনিধিকে বলেন, ১৯ জুলাই বিকেলে ফোন করে জিহাদ বলে আমার বুকে গুলি লেগেছে| বাবা-মাকে বলিস না, বাঁচলে দেখা হবে| ঐদিনই ছিলো ছোট ভাই জিহাদের সাথে শেষ কথা| ভাই জিহাদ অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রাণ দিয়েছে| দেশে বিদ্যমান ¯ৈ^রাচার সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, আন্দোলন করেছে| আগামীর বাংলাদেশ যেনো সুন্দর হয়, দুর্নীতিমুক্ত হয়| যুগ যুগ ধরে আগামী প্রজন্ম যেনো আমার ভাইয়ের এই অবদান মনে রাখে| যে ¯ৈ^রতন্ত্র শেখ হাসিনা কায়েম করে ছিলো অন্য কোনো দল ভবিষ্যতে এই ধরনের চেষ্টাও যেনো না করে| তা হলেই আমার ভাই ভালো থাকবে| আমার ভাইয়ের আত্মাও শান্তি পাবে|
শিরোনাম :
দশমিনায় শহীদ জিহাদের রক্তমাখা জামাটাই শুধু স্মৃতি
-
দশমিনা(পটুয়াখালী)প্রতিনিধি - প্রকাশিত সময় ০৬:৪৬:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
- ৪৯ পড়েছেন
Tag :
জনপ্রিয়
















