ঢাকা ১১:০৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ প্রকাশের পরও ঘুম ভাঙেনি কর্তৃপক্ষের

পাইকগাছায় সাড়ে চার কিলোমিটার সড়কের বেহাল দশা

উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি আর আশ্বাসের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক। উপজেলার ১০নং গড়ইখালী ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ আমিরপুর-বাইনবাড়িয়া সড়কটির বেহাল দশা নিয়ে ইতিপূর্বে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, খবর প্রকাশের পরও এখনো পর্যন্ত কোনো টনক নড়েনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। দেবব্রতের দোকান থেকে বাইনবাড়িয়া পুলিশ ক্যাম্প হয়ে রমাকান্ত সরদারের বাড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই কঙ্কালসার সড়কটি সংস্কারের জন্য আজ অবধি কোনো পদক্ষেপের প্রস্তুতিও নেয়নি স্থানীয় প্রশাসন। ফলে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও হতাশায় এখন এলাকার হাজার হাজার মানুষ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কটির পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ইতিপূর্বে গণমাধ্যমে যে খানাখন্দের চিত্র উঠে এসেছিল, তা এখন স্থায়ী কৃত্রিম ডোবায় পরিণত হয়েছে। পিচ ঢালাই তো দূরের কথা, আগে যে ইটের সলিং ছিল, তার অধিকাংশ জায়গার ইট সম্পূর্ণ উপড়ে গিয়ে ভেতরের মাটি বের হয়ে গেছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই পুরো রাস্তা জুড়েই তৈরি হচ্ছে কর্দমাক্ত মরণফাঁদ। যানবাহন চলাচল তো দূরের কথা, সাধারণ মানুষের পায়ে হেঁটে চলার উপায়ও আর অবশিষ্ট নেই। এই ভাঙা পথমাড়িয়েই প্রতিদিন স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
রাস্তার এই জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে সবচেয়ে মারাত্মক ও অমানবিক বিপাকে পড়েছেন এলাকার গর্ভবতী নারী, শিশু এবং বৃদ্ধ রোগীরা। গ্রামে কোনো ভ্যান, ইজিবাইক বা জরুরি প্রয়োজনে কোনো অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ করতে পারে না। ফলে মুমূর্ষু রোগীকে খাটিয়ায় করে কিংবা কোলে তুলে মাইলের পর মাইল হেঁটে মূল সড়ক পর্যন্ত নিয়ে যেতে হয়। এভাবে পথিমধ্যে সময় ক্ষেপণ হওয়ার কারণে বহু রোগীর স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়ছে এবং অনেকেই সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে ধুঁকছেন। চিকিৎসাসেবা পাওয়ার এই আদিম ও মধ্যযুগীয় সংগ্রাম যেন এই এলাকার মানুষের কপাললিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার এমন পঙ্গুত্বের কারণে অবহেলিত এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডও ভেঙে পড়ছে। কৃষিপ্রধান এই এলাকার কৃষকেরা তাদের হাড়ভাঙা খাটুনিতে উৎপাদিত ফসল সময়মতো বাজারে নিয়ে সঠিক মূল্যে বিক্রি করতে পারছেন না। রাস্তার ভয়ে পাইকাররা এলাকায় আসতে চান না, আর আসলেও যাতায়াত খরচের অজুহাতে পণ্যের দাম দিচ্ছেন পানির দরে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত ও দেউলিয়া হওয়ার পথে স্থানীয় কৃষিজীবী ও ব্যবসায়ী সমাজ।
বারবার সংবাদ প্রকাশের পরও কর্তৃপক্ষের এই রহস্যজনক নীরবতায় সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। ভোটের সময় বড় বড় বুলি আওড়ানো নেতাদের ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, “পেপারে খবর আসার পরও যাদের ঘুম ভাঙছে না, তারা ভোটের পরে আমাদের বাস্তব কষ্ট দেখতে আসেন না কেন? আমরা শুধু প্রতিশ্রুতির কাগজে আটকে আছি।” এলাকাবাসীর স্পষ্ট দাবি—আসন্ন পূর্ণাঙ্গ বর্ষা মৌসুম পুরোপুরি জেঁকে বসার আগেই এই সড়কটিতে নতুন করে টেকসই সংস্কার বা পিচ ঢালাইয়ের কাজ শুরু করতে হবে।
এদিকে, পূর্বে সংবাদ প্রকাশের সময়ও গড়ইখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম কেরুর সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। বর্তমানেও এই জনদুর্ভোগ নিরসনে ইউনিয়ন পরিষদ বা পাইকগাছা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ বা পরিকল্পনার প্রস্তুতি লক্ষ্য করা যায়নি।

Tag :

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

জনপ্রিয়

সংবাদ প্রকাশের পরও ঘুম ভাঙেনি কর্তৃপক্ষের

পাইকগাছায় সাড়ে চার কিলোমিটার সড়কের বেহাল দশা

প্রকাশিত সময় ০২:৫২:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬

উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি আর আশ্বাসের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক। উপজেলার ১০নং গড়ইখালী ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ আমিরপুর-বাইনবাড়িয়া সড়কটির বেহাল দশা নিয়ে ইতিপূর্বে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, খবর প্রকাশের পরও এখনো পর্যন্ত কোনো টনক নড়েনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। দেবব্রতের দোকান থেকে বাইনবাড়িয়া পুলিশ ক্যাম্প হয়ে রমাকান্ত সরদারের বাড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই কঙ্কালসার সড়কটি সংস্কারের জন্য আজ অবধি কোনো পদক্ষেপের প্রস্তুতিও নেয়নি স্থানীয় প্রশাসন। ফলে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও হতাশায় এখন এলাকার হাজার হাজার মানুষ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কটির পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ইতিপূর্বে গণমাধ্যমে যে খানাখন্দের চিত্র উঠে এসেছিল, তা এখন স্থায়ী কৃত্রিম ডোবায় পরিণত হয়েছে। পিচ ঢালাই তো দূরের কথা, আগে যে ইটের সলিং ছিল, তার অধিকাংশ জায়গার ইট সম্পূর্ণ উপড়ে গিয়ে ভেতরের মাটি বের হয়ে গেছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই পুরো রাস্তা জুড়েই তৈরি হচ্ছে কর্দমাক্ত মরণফাঁদ। যানবাহন চলাচল তো দূরের কথা, সাধারণ মানুষের পায়ে হেঁটে চলার উপায়ও আর অবশিষ্ট নেই। এই ভাঙা পথমাড়িয়েই প্রতিদিন স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
রাস্তার এই জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে সবচেয়ে মারাত্মক ও অমানবিক বিপাকে পড়েছেন এলাকার গর্ভবতী নারী, শিশু এবং বৃদ্ধ রোগীরা। গ্রামে কোনো ভ্যান, ইজিবাইক বা জরুরি প্রয়োজনে কোনো অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ করতে পারে না। ফলে মুমূর্ষু রোগীকে খাটিয়ায় করে কিংবা কোলে তুলে মাইলের পর মাইল হেঁটে মূল সড়ক পর্যন্ত নিয়ে যেতে হয়। এভাবে পথিমধ্যে সময় ক্ষেপণ হওয়ার কারণে বহু রোগীর স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়ছে এবং অনেকেই সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে ধুঁকছেন। চিকিৎসাসেবা পাওয়ার এই আদিম ও মধ্যযুগীয় সংগ্রাম যেন এই এলাকার মানুষের কপাললিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার এমন পঙ্গুত্বের কারণে অবহেলিত এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডও ভেঙে পড়ছে। কৃষিপ্রধান এই এলাকার কৃষকেরা তাদের হাড়ভাঙা খাটুনিতে উৎপাদিত ফসল সময়মতো বাজারে নিয়ে সঠিক মূল্যে বিক্রি করতে পারছেন না। রাস্তার ভয়ে পাইকাররা এলাকায় আসতে চান না, আর আসলেও যাতায়াত খরচের অজুহাতে পণ্যের দাম দিচ্ছেন পানির দরে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত ও দেউলিয়া হওয়ার পথে স্থানীয় কৃষিজীবী ও ব্যবসায়ী সমাজ।
বারবার সংবাদ প্রকাশের পরও কর্তৃপক্ষের এই রহস্যজনক নীরবতায় সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। ভোটের সময় বড় বড় বুলি আওড়ানো নেতাদের ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, “পেপারে খবর আসার পরও যাদের ঘুম ভাঙছে না, তারা ভোটের পরে আমাদের বাস্তব কষ্ট দেখতে আসেন না কেন? আমরা শুধু প্রতিশ্রুতির কাগজে আটকে আছি।” এলাকাবাসীর স্পষ্ট দাবি—আসন্ন পূর্ণাঙ্গ বর্ষা মৌসুম পুরোপুরি জেঁকে বসার আগেই এই সড়কটিতে নতুন করে টেকসই সংস্কার বা পিচ ঢালাইয়ের কাজ শুরু করতে হবে।
এদিকে, পূর্বে সংবাদ প্রকাশের সময়ও গড়ইখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম কেরুর সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। বর্তমানেও এই জনদুর্ভোগ নিরসনে ইউনিয়ন পরিষদ বা পাইকগাছা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ বা পরিকল্পনার প্রস্তুতি লক্ষ্য করা যায়নি।