সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়ম ও প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ঝাড়খণ্ডে তীব্র আন্দোলনে নেমেছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী। সোমবার (১০ আগস্ট) রাজ্য বিধানসভা অভিমুখে বিক্ষোভকারীদের ‘বিধানসভা ঘেরাও’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানী রাঁচিজুড়ে। ব্যারিকেড ভেঙে বিক্ষোভকারীরা বিধানসভার দিকে এগোনোর চেষ্টা করতেই পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ করে এবং জলকামান ও টিয়ার গ্যাসে নিক্ষেপ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (জেপিএসসি) ১৪তম প্রিলিমিনারি এবং ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশন (জেএসএসসি) পরীক্ষায় বড় ধরনের দুর্নীতি ও প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের যৌথ আহ্বানে রাঁচির রাস্তায় নামে হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী ও শিক্ষার্থী।
আন্দোলনকারীদের বিধানসভা ভবনে পৌঁছানো আটকাতে রাঁচি প্রশাসন ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ও বিধানসভার সংযোগকারী রাস্তায় তিন স্তরের ভারী ব্যারিকেড তৈরি করা হয়।
দুপুরের দিকে মিছিলটি বিধানসভার কাছাকাছি পৌঁছালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। উত্তেজিত ছাত্ররা সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দিতে পুলিশের প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের ব্যারিকেড উপড়ে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশ বারবার তাদের থামার অনুরোধ করলেও ক্ষুব্ধ ছাত্ররা তা অমান্য করে কর্ডন ভেঙে ফেলার চেষ্টা চালায়।
ব্যারিকেড ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ কড়া অ্যাকশনে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রথমে জলকামান থেকে তীব্র গতিতে জল স্প্রে করা হয়। তাতেও জনতাকে ছত্রভঙ্গ করা না গেলে পুলিশ লাঠি উঁচিয়ে তাড়া করে। শুরু হয় নির্মম লাঠিচার্জ। পুলিশের লাঠির আঘাতে বেশ কয়েকজন ছাত্র আহত হন এবং হুড়োহুড়িতে পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
পাল্টা জবাবে ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীদের কেউ কেউ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছোড়ে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুরো এলাকাটি মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়া এবং আর্তনাদে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে পুলিশ আটক করেছে।
টানা ১৬ দিন ধরে অনশনরত ছাত্রনেতা দেবেন্দ্র মাহতো বিক্ষোভকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, পুলিশ বাধা দিলে যেন তাঁরা তর্ক না করেন এবং শৃঙ্খলার সাথে বিধানসভায় পৌঁছানোর জন্য নতুন পথ খুঁজুন।
এদিকে রাঁচির রাস্তায় যখন লাঠি আর জলকামানের গর্জন, ঠিক তখনই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন নমনীয় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন।
এই ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘নিজেদের ঘরের মানুষের ওপর, যুবসমাজের ওপর লাঠি চালিয়ে কোনো স্থায়ী সমাধান আসতে পারে না। আমাদের ঘরের ছেলেরা ক্ষুব্ধ হতে পারে, কিন্তু তাদের সাথে শত্রুতা করা আমাদের কাজ নয়। লাঠি নয়, আলোচনার মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান হতে পারে।’
মুখ্যমন্ত্রী আরও আশ্বাস দেন, ছাত্রদের দাবিদাওয়া সরকার অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং খুব শিগগিরই ছাত্র প্রতিনিধিদের সাথে সরাসরি আলোচনায় বসার রাস্তা তৈরি করা হবে।
প্রসঙ্গত, টানা ১৬ দিন ধরে চলা এই আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা সিবিআই তদন্তের দাবিতে অনড় রয়েছে। অনশনে থাকা শিক্ষার্থী নেতা দেবেন্দ্র মাহাতো ও রবীন্দ্র পাসোয়ান জানান, সরকার ১৩টি পরীক্ষার মধ্যে কেবল ৩টি বাতিলের প্রস্তাব দিয়েছে, যা পর্যাপ্ত নয়।
অন্যদিকে সরকার দাবি করেছে, তারা শিক্ষার্থীদের ৯৮ শতাংশ দাবি মেনে নিয়েছে। ইতোমধ্যেই ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (জেপিএসসি) চেয়ারম্যান এল খিয়াংতসহ মোট চার কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন।
এদিকে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঝাড়খণ্ডের রাজনৈতিক পারদ এক ধাক্কায় অনেকটাই চড়ে গেছে। বিরোধী দল বিজেপি এই পুলিশি দমনপীড়নের তীব্র সমালোচনা করে হেমন্ত সোরেন সরকারকে ‘যুব-বিরোধী’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
তাদের দাবি, চাকরি চাওয়ার অপরাধে ছাত্রদের ওপর এই বর্বর আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 















