ঢাকা ০৫:২০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
হাজারো জেলে পরিবার হতাশ

দাকোপে ভরা মৌসুমেও নদীতে ইলিশের আকাল

খুলনার দাকোপে ভরা মৌসুমেও স্থানীয় বিভিন্ন নদীতে দেশের জাতীয় মাছ ইলিশের দেখা মিলছে না। এতে একদিকে এলাকার জনসাধারণ রূপালী ইলিশের স্বাদ ভুলতে বসেছেন। অন্যদিকে বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন উপজেলার হাজারো জেলে পরিবার।
উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পৃথক ৩টি দ্বীপের সমন্বয় গঠিত এই উপজেলা। এর চারপাশে নদী দিয়ে পরিবেষ্টিত। এঅঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ এক সময়ে মৎস্য আহরনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন। আর এ মৎস্য আহরনের অভয়ারণ্য ছিল উপজেলার উল্লে¬খযোগ্য ঢাকী, ভদ্রা, শিবসা, কাজীবাছা, মাঙ্গা, পশুর ও ঝপঝপিয়া নদী। বর্তমানে বিভিন্ন এলাকার প্রায় হাজারো জেলে পরিবার এই পেশার উপর নির্ভরশীল। এসব জেলেরা বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ ও মহাজনের দাদন নিয়ে জাল নৌকা কিনে অনেকে নদীতে নেমেছেন। কিন্তু দিনরাত নদীতে জাল ফেলেও ইলিশ না পেয়ে তারা নিরাশ হয়ে বাড়ি ফিরছেন। এমনকি ভরা মৌসুমেও ইলিশের দেখা পাচ্ছেন না এসব জেলেরা। যে কারনে উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারেও ক্রেতাদের সাথে ইলিশের দেখা মিলছে খুব কম। মাঝে মধ্যে দুই একজন জেলের জালে দুই একটি মাছ ধরা পড়লেও বাজারে তার দাম অনেক বেশি। যা সাধারন মানুষ কিনে খেতে পারছেন না। এনজিও ঋনের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় তাদের সাথে প্রায়ই বাক-বিতন্ডায় জড়িয়ে পড়ছেন জেলেরা। মাঝে মধ্যে আবার আত্মগোপন করেও থাকতে হচ্ছে অনেক জেলেকে। অন্য কোন আয়ের উৎস্য না থাকায় বেকার হয়ে পড়েছেন উপজেলার এসকল জেলে পরিবারগুলো। জেলেদের পরিবারের সদস্যরা প্রায়ই অনাহারে অর্ধহারে দিন কাটাছেন। এতে জেলেরা অর্থ কষ্টে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আবার সাধারন মানুষও রূপালী ইলিশ মাছের স্বাদ প্রায় ভুলতে বসেছেন। এদিকে দীর্ঘদিন ইলিশের দেখা না পেয়ে ইতি মধ্যে এ পেশা বদল করেছেন অনেকে।
পশুর নদীর জেলে উপজেলার চালনা এলাকার রাজু শেখ জানান, তার একমাত্র পেশা ইলিশ মাছ ধরা। চলতি মৌসুমে সমিতি থেকে ঋণ ও আড়ত থেকে দাদন নিয়ে জাল এবং নৌকা কিনেছেন। কিন্তু ভরা মৌসুমেও নদীতে দিনরাত জাল ফেলে দুই একটি ইলিশ মাছের দেখা মিললেও প্রত্যাশা অনুযায়ী মাছ না পেয়ে হতাশায় ভুগছেন। এতে অভাব অনাটনে তাদের ৪টি পরিবার অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। সরকার সহজ শর্তে ঋণ দিলে তাদের কিছুটা মাথা গোজার ঠাই হতো বলে তিনি জানান।
মাছ বাজারে এ প্রতিবেদকের কথা হয় চালনা সবুজ পল্লী এলাকার সোহাগ আহমেদ নামে এক ক্রেতার। তিনি বলেন স্থানীয় নদীর ইলিশের স্বাদ বেশি বিধায় মাছ কিনতে এসেছেন। কিন্তু বাজারে দুই একটা মাছ আসায় দাম অত্যান্ত চড়া। তার পক্ষে এতো দামে মাছ কিনে খাওয়া সম্ভব না। তাই মাছ না কিনে তিনি নিরাশ হয়ে বাড়ি ফিরছেন।
চালনা বৌমার গাছতলার মাছ বাজারের ব্যবসায়ী জনি বিশ্বাস জানান, স্থানীয় নদীর ইলিশ তেমন একটা বাজারে আসছে না। যা দুই একটা আসছে তা এক কেজি ওজনের মাছ ২৫০০ থেকে ২৬০০ টাকা বিক্রি করছেন। আর ৬০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের মাছ ১৭০০ থেকে ১৮০০ টাকা। এ ছাড়া বরিশালের ঝাটকা ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা বিক্রি করছেন।
এব্যাপারে উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, এ বছর শ্রাবণ মাস প্রায় শেষ হলেও স্বাভাবিক মাত্রায় বৃষ্টিপাত হয়নি। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় নদ-নদীতে মিঠা পানির প্রবাহ কমেছে এবং অনেক নদীর নাব্যতা ও গভীরতা হ্রাস পেয়েছে। ফলে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ, খাদ্য সংগ্রহ এবং প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ পুরোপুরি তৈরি হয়নি। এছাড়া নদীতে পানির প্রবাহ কম থাকায় সাগর থেকে ইলিশের উজানে অভিবাসনও কিছুটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে ইলিশের উৎপাদন অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। যেমন আবহাওয়া, নদীর পানি প্রবাহ, লবণাক্ততার পরিবর্তন, খাদ্যের প্রাপ্যতা, প্রজনন মৌসুমের পরিবেশ এবং সংরক্ষণ কার্যক্রমের সফলতা। তাই বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায় যদি মৌসুমের বাকি সময়ে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত না হয় এবং নদীতে পর্যাপ্ত পানি প্রবাহ ফিরে না আসে তাহলে এ বছর ইলিশের উৎপাদন গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

Tag :

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

জনপ্রিয়

হাজারো জেলে পরিবার হতাশ

দাকোপে ভরা মৌসুমেও নদীতে ইলিশের আকাল

প্রকাশিত সময় ০১:৫৫:৪৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

খুলনার দাকোপে ভরা মৌসুমেও স্থানীয় বিভিন্ন নদীতে দেশের জাতীয় মাছ ইলিশের দেখা মিলছে না। এতে একদিকে এলাকার জনসাধারণ রূপালী ইলিশের স্বাদ ভুলতে বসেছেন। অন্যদিকে বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন উপজেলার হাজারো জেলে পরিবার।
উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পৃথক ৩টি দ্বীপের সমন্বয় গঠিত এই উপজেলা। এর চারপাশে নদী দিয়ে পরিবেষ্টিত। এঅঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ এক সময়ে মৎস্য আহরনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন। আর এ মৎস্য আহরনের অভয়ারণ্য ছিল উপজেলার উল্লে¬খযোগ্য ঢাকী, ভদ্রা, শিবসা, কাজীবাছা, মাঙ্গা, পশুর ও ঝপঝপিয়া নদী। বর্তমানে বিভিন্ন এলাকার প্রায় হাজারো জেলে পরিবার এই পেশার উপর নির্ভরশীল। এসব জেলেরা বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ ও মহাজনের দাদন নিয়ে জাল নৌকা কিনে অনেকে নদীতে নেমেছেন। কিন্তু দিনরাত নদীতে জাল ফেলেও ইলিশ না পেয়ে তারা নিরাশ হয়ে বাড়ি ফিরছেন। এমনকি ভরা মৌসুমেও ইলিশের দেখা পাচ্ছেন না এসব জেলেরা। যে কারনে উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারেও ক্রেতাদের সাথে ইলিশের দেখা মিলছে খুব কম। মাঝে মধ্যে দুই একজন জেলের জালে দুই একটি মাছ ধরা পড়লেও বাজারে তার দাম অনেক বেশি। যা সাধারন মানুষ কিনে খেতে পারছেন না। এনজিও ঋনের কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় তাদের সাথে প্রায়ই বাক-বিতন্ডায় জড়িয়ে পড়ছেন জেলেরা। মাঝে মধ্যে আবার আত্মগোপন করেও থাকতে হচ্ছে অনেক জেলেকে। অন্য কোন আয়ের উৎস্য না থাকায় বেকার হয়ে পড়েছেন উপজেলার এসকল জেলে পরিবারগুলো। জেলেদের পরিবারের সদস্যরা প্রায়ই অনাহারে অর্ধহারে দিন কাটাছেন। এতে জেলেরা অর্থ কষ্টে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আবার সাধারন মানুষও রূপালী ইলিশ মাছের স্বাদ প্রায় ভুলতে বসেছেন। এদিকে দীর্ঘদিন ইলিশের দেখা না পেয়ে ইতি মধ্যে এ পেশা বদল করেছেন অনেকে।
পশুর নদীর জেলে উপজেলার চালনা এলাকার রাজু শেখ জানান, তার একমাত্র পেশা ইলিশ মাছ ধরা। চলতি মৌসুমে সমিতি থেকে ঋণ ও আড়ত থেকে দাদন নিয়ে জাল এবং নৌকা কিনেছেন। কিন্তু ভরা মৌসুমেও নদীতে দিনরাত জাল ফেলে দুই একটি ইলিশ মাছের দেখা মিললেও প্রত্যাশা অনুযায়ী মাছ না পেয়ে হতাশায় ভুগছেন। এতে অভাব অনাটনে তাদের ৪টি পরিবার অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। সরকার সহজ শর্তে ঋণ দিলে তাদের কিছুটা মাথা গোজার ঠাই হতো বলে তিনি জানান।
মাছ বাজারে এ প্রতিবেদকের কথা হয় চালনা সবুজ পল্লী এলাকার সোহাগ আহমেদ নামে এক ক্রেতার। তিনি বলেন স্থানীয় নদীর ইলিশের স্বাদ বেশি বিধায় মাছ কিনতে এসেছেন। কিন্তু বাজারে দুই একটা মাছ আসায় দাম অত্যান্ত চড়া। তার পক্ষে এতো দামে মাছ কিনে খাওয়া সম্ভব না। তাই মাছ না কিনে তিনি নিরাশ হয়ে বাড়ি ফিরছেন।
চালনা বৌমার গাছতলার মাছ বাজারের ব্যবসায়ী জনি বিশ্বাস জানান, স্থানীয় নদীর ইলিশ তেমন একটা বাজারে আসছে না। যা দুই একটা আসছে তা এক কেজি ওজনের মাছ ২৫০০ থেকে ২৬০০ টাকা বিক্রি করছেন। আর ৬০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের মাছ ১৭০০ থেকে ১৮০০ টাকা। এ ছাড়া বরিশালের ঝাটকা ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা বিক্রি করছেন।
এব্যাপারে উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, এ বছর শ্রাবণ মাস প্রায় শেষ হলেও স্বাভাবিক মাত্রায় বৃষ্টিপাত হয়নি। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় নদ-নদীতে মিঠা পানির প্রবাহ কমেছে এবং অনেক নদীর নাব্যতা ও গভীরতা হ্রাস পেয়েছে। ফলে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ, খাদ্য সংগ্রহ এবং প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ পুরোপুরি তৈরি হয়নি। এছাড়া নদীতে পানির প্রবাহ কম থাকায় সাগর থেকে ইলিশের উজানে অভিবাসনও কিছুটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে ইলিশের উৎপাদন অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। যেমন আবহাওয়া, নদীর পানি প্রবাহ, লবণাক্ততার পরিবর্তন, খাদ্যের প্রাপ্যতা, প্রজনন মৌসুমের পরিবেশ এবং সংরক্ষণ কার্যক্রমের সফলতা। তাই বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায় যদি মৌসুমের বাকি সময়ে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত না হয় এবং নদীতে পর্যাপ্ত পানি প্রবাহ ফিরে না আসে তাহলে এ বছর ইলিশের উৎপাদন গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।