ঢাকা ১১:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাইকগাছায় কাঠলিচুর বাম্পার ফলন: রেকর্ড উৎপাদনের মুখে হাসছেন চাষিরা

গ্রীষ্মের জনপ্রিয় ফল লিচুর বিদায়ের পর এখন উপকূলীয় অঞ্চল পাইকগাছার বাজারে রাজত্ব করছে তারই সমগোত্রীয় সুস্বাদু ফল ‘আঁশফল’। স্থানীয়ভাবে এটি ‘কাঠলিচু’ কিংবা ‘লংগান’ নামে সমধিক পরিচিত। চলতি মরসুমে খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় এই ফলের নজিরবিহীন ফলন হয়েছে। উপজেলার প্রায় প্রতিটি গাছেই পাতার চেয়ে ফলের আধিক্য বেশি চোখে পড়ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, চলতি বছর সমগ্র বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আঁশফলের উৎপাদন হয়েছে এই পাইকগাছা অঞ্চলে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সময় বিদেশি ফল ও বড় জাতের লিচুর দাপটে ঐতিহ্যবাহী এই ফলটি গুরুত্ব হারালেও, সম্প্রতি উন্নত ও হাইব্রিড জাত প্রবর্তনের ফলে এর কদর ও বাজারমূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ফলটি যেমন মিষ্টি, তেমনই রসালো। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে পাইকগাছার প্রায় ৮ হেক্টর জমিতে আঁশফলের আবাদ হয়েছে, যা থেকে এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে রেকর্ড ৪০ মেট্রিক টন ফলন উৎপাদিত হয়েছে। উপজেলার গদাইপুর, রাড়ুলী, হরিঢালী ও কপিলমুনি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ও বাড়ির আঙিনায় ডালপালা জুড়ে এখন শুধুই আঁশফলের সমারোহ। চাহিদা বাড়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতেও গতি এসেছে। উপজেলার রাড়ুলী ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী কাঠিপাড়া বাজারে প্রতিদিন ভোরে বসছে আঁশফলের বিশাল পাইকারি হাট। সেখান থেকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ফল কিনে স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে দ্রুত সরবরাহ করছেন। বর্তমানে বাজারে প্রতি একশত আঁশফল ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে। এছাড়া, গাছের আকার অনুযায়ী পাইকারি বাজারে একেকটি গাছের ফল ৮শ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে, যা বাগান মালিকদের ভালো মুনাফা এনে দিচ্ছে। পাইকারি বাজারের পাশাপাশি উপজেলার প্রতিটি আনাচে-কানাচে এখন আঁশফল বিক্রির ধুম পড়েছে। বিভিন্ন হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে, গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে এবং রাস্তার পাশে ভ্যানের ওপর ও নিচে ঝুড়ি সাজিয়ে খুচরা বিক্রেতাদের এই ফল বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে। এদের মধ্যে কেউ পাইকারি হাট থেকে ফল কিনে এনেছেন, আবার কেউ কেউ নিজের বাগানের গাছ থেকে টাটকা আঁশফল পেড়ে এনে সরাসরি ক্রেতাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। সহজলভ্য ও সুস্বাদু হওয়ায় সাধারণ ক্রেতারাও বেশ আগ্রহ নিয়ে এই ফল কিনছেন। তবে কাঙ্ক্ষিত ফলন হলেও ফল রক্ষায় বেশ বেগ পেতে হচ্ছে চাষি ও ব্যবসায়ীদের। মঠবাটী গ্রামের আঁশফল ব্যবসায়ী আলাউদ্দীন ও জিনারুল জানান, “ফল পাকার পর দ্রুত সংগ্রহ না করলে তা ঝরে পড়ে। তার চেয়েও বড় সমস্যা হলো নিশাচর বাদুড়ের দল। এক রাতেই এরা পুরো বাগানের ফল সাবাড় করে দিতে পারে। তাই বাদুড়ের আক্রমণ থেকে বাঁচতে আমরা প্রায় প্রতিটি গাছ বিশেষ নেট বা জাল দিয়ে মুড়িয়ে রেখেছি।” তারা জানান, আগস্ট মাস পর্যন্ত বাজারে এই ফলের সরবরাহ থাকবে।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ একরামুল হোসেন বলেন, “আঁশফল অত্যন্ত পুষ্টিকর ও একটি লাভজনক ফসল। আগে দেশি জাতের গুণগত মান কিছুটা কম থাকলেও, বর্তমানে হাইব্রিড জাতের আঁশফল আকারে বেশ বড় এবং এর বাজার চাহিদাও চমৎকার। বাড়ির আশপাশের অনাবাদী ও পরিত্যক্ত জমিতে সহজেই এই গাছের চাষ করা সম্ভব। এবার পাইকগাছায় যে রেকর্ড ফলন হয়েছে, তা কৃষকদের মাঝে নতুন আশা জাগিয়েছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে আমরা স্থানীয় চাষিদের এই ফলের চারা রোপণে নিয়মিত পরামর্শ ও উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছি।”

Tag :

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

জনপ্রিয়

পাইকগাছায় কাঠলিচুর বাম্পার ফলন: রেকর্ড উৎপাদনের মুখে হাসছেন চাষিরা

প্রকাশিত সময় ০৩:৪১:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬

গ্রীষ্মের জনপ্রিয় ফল লিচুর বিদায়ের পর এখন উপকূলীয় অঞ্চল পাইকগাছার বাজারে রাজত্ব করছে তারই সমগোত্রীয় সুস্বাদু ফল ‘আঁশফল’। স্থানীয়ভাবে এটি ‘কাঠলিচু’ কিংবা ‘লংগান’ নামে সমধিক পরিচিত। চলতি মরসুমে খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় এই ফলের নজিরবিহীন ফলন হয়েছে। উপজেলার প্রায় প্রতিটি গাছেই পাতার চেয়ে ফলের আধিক্য বেশি চোখে পড়ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, চলতি বছর সমগ্র বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আঁশফলের উৎপাদন হয়েছে এই পাইকগাছা অঞ্চলে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সময় বিদেশি ফল ও বড় জাতের লিচুর দাপটে ঐতিহ্যবাহী এই ফলটি গুরুত্ব হারালেও, সম্প্রতি উন্নত ও হাইব্রিড জাত প্রবর্তনের ফলে এর কদর ও বাজারমূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ফলটি যেমন মিষ্টি, তেমনই রসালো। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে পাইকগাছার প্রায় ৮ হেক্টর জমিতে আঁশফলের আবাদ হয়েছে, যা থেকে এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে রেকর্ড ৪০ মেট্রিক টন ফলন উৎপাদিত হয়েছে। উপজেলার গদাইপুর, রাড়ুলী, হরিঢালী ও কপিলমুনি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ও বাড়ির আঙিনায় ডালপালা জুড়ে এখন শুধুই আঁশফলের সমারোহ। চাহিদা বাড়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতেও গতি এসেছে। উপজেলার রাড়ুলী ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী কাঠিপাড়া বাজারে প্রতিদিন ভোরে বসছে আঁশফলের বিশাল পাইকারি হাট। সেখান থেকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ফল কিনে স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে দ্রুত সরবরাহ করছেন। বর্তমানে বাজারে প্রতি একশত আঁশফল ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে। এছাড়া, গাছের আকার অনুযায়ী পাইকারি বাজারে একেকটি গাছের ফল ৮শ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে, যা বাগান মালিকদের ভালো মুনাফা এনে দিচ্ছে। পাইকারি বাজারের পাশাপাশি উপজেলার প্রতিটি আনাচে-কানাচে এখন আঁশফল বিক্রির ধুম পড়েছে। বিভিন্ন হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে, গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে এবং রাস্তার পাশে ভ্যানের ওপর ও নিচে ঝুড়ি সাজিয়ে খুচরা বিক্রেতাদের এই ফল বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে। এদের মধ্যে কেউ পাইকারি হাট থেকে ফল কিনে এনেছেন, আবার কেউ কেউ নিজের বাগানের গাছ থেকে টাটকা আঁশফল পেড়ে এনে সরাসরি ক্রেতাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। সহজলভ্য ও সুস্বাদু হওয়ায় সাধারণ ক্রেতারাও বেশ আগ্রহ নিয়ে এই ফল কিনছেন। তবে কাঙ্ক্ষিত ফলন হলেও ফল রক্ষায় বেশ বেগ পেতে হচ্ছে চাষি ও ব্যবসায়ীদের। মঠবাটী গ্রামের আঁশফল ব্যবসায়ী আলাউদ্দীন ও জিনারুল জানান, “ফল পাকার পর দ্রুত সংগ্রহ না করলে তা ঝরে পড়ে। তার চেয়েও বড় সমস্যা হলো নিশাচর বাদুড়ের দল। এক রাতেই এরা পুরো বাগানের ফল সাবাড় করে দিতে পারে। তাই বাদুড়ের আক্রমণ থেকে বাঁচতে আমরা প্রায় প্রতিটি গাছ বিশেষ নেট বা জাল দিয়ে মুড়িয়ে রেখেছি।” তারা জানান, আগস্ট মাস পর্যন্ত বাজারে এই ফলের সরবরাহ থাকবে।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ একরামুল হোসেন বলেন, “আঁশফল অত্যন্ত পুষ্টিকর ও একটি লাভজনক ফসল। আগে দেশি জাতের গুণগত মান কিছুটা কম থাকলেও, বর্তমানে হাইব্রিড জাতের আঁশফল আকারে বেশ বড় এবং এর বাজার চাহিদাও চমৎকার। বাড়ির আশপাশের অনাবাদী ও পরিত্যক্ত জমিতে সহজেই এই গাছের চাষ করা সম্ভব। এবার পাইকগাছায় যে রেকর্ড ফলন হয়েছে, তা কৃষকদের মাঝে নতুন আশা জাগিয়েছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে আমরা স্থানীয় চাষিদের এই ফলের চারা রোপণে নিয়মিত পরামর্শ ও উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছি।”