ঢাকা ০১:১০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ঝুঁকিতে হাজারো মানুষ

পাইকগাছায় মরণফাঁদে পরিণত খড়িয়া-ভড়েঙ্গা ব্রিজ

খুলনার পাইকগাছা উপজেলার লস্কর ইউনিয়নের খড়িয়া-ভড়েঙ্গা চক গ্রামে ভড়েঙ্গা খালের ওপর নির্মিত সেতুটি এখন এলাকাবাসীর জন্য এক চরম আতঙ্কের নাম। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারহীন অবস্থায় পড়ে থাকা এই সেতুটি বর্তমানে সম্পূর্ণ চলাচলের অযোগ্য হয়ে ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। সেতুর মাঝখানে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় এবং মূল কাঠামোর কংক্রিট খসে পড়ে মরিচাপড়া লোহার রড বেরিয়ে আসায় যেকোনো মুহূর্তে এটি ধসে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে স্থানীয় খড়িয়া সবুজ পল্লী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই ভাঙা সেতু পার হয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৩০ বছর আগে নির্মিত এই সেতুর মাঝ বরাবর দুটি বড় অংশ ধসে গিয়ে নিচের খালের পানি সরাসরি দৃশ্যমান হচ্ছে। পুরো সেতুজুড়ে অসংখ্য ফাটল ও ক্ষয় ধরেছে। দুই পাশের রেলিং বহু আগেই ভেঙে পড়েছে, যেখানে এখন শুধু জং ধরা রডের কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে। সেতুর নিচের পিলারগুলোও নোনা পানির প্রভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এছাড়া সেতুর দুপাশের সংযোগ সড়ক (অ্যাপ্রোচ রোড) না থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা তাপসী, অনিমা মন্ডলরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বহু বছর ধরে সেতুটি এই জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে, কিন্তু এটি সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রতিদিন আমাদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এই ভাঙা সেতুর ওপর দিয়ে স্কুলে যায়। সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয়, কখন কী দুর্ঘটনা ঘটে যায়।” আরেক বাসিন্দা উত্তম, প্রসেনজিৎ, উজ্জ্বল মন্ডল জানান, বর্ষা মৌসুমে এবং রাতের অন্ধকারে এই পথ দিয়ে চলাচল করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সামান্য অসাবধানতার কারণে যেকোনো সময় বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে। শুধু স্কুলগামী শিশুরাই নয়, এই সেতুর জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় কৃষক, মৎস্যজীবী ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা। এলাকাটি কৃষি ও মৎস্যপ্রধান হওয়ায় উৎপাদিত নিত্যপণ্য ও মাছ যথাসময়ে বাজারে আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া গ্রামে কেউ হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার মতো কোনো জরুরি যাতায়াত ব্যবস্থাও এখন আর অবশিষ্ট নেই। এ বিষয়ে লস্কর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “ব্রিজটি প্রায় তিন দশক আগের। এলাকার অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে এর ঢালাই ও ভেতরের রড সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এটি এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অবর্ণনীয় এই দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পেতে এখানে একটি নতুন ব্রিজ নির্মাণ করা জরুরি প্রয়োজন। যোগাযোগ করা হলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রাজিব বিশ্বাস জানান, “সেতুটি আসলেই বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। সরকারি নতুন বরাদ্দ পেলেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এখানে একটি নতুন সেতু নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।”
কোনো বড় ধরনের প্রাণহানি বা মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর যেন কর্তৃপক্ষের ঘুম না ভাঙে- এমনটাই দাবি স্থানীয় ভুক্তভোগীদের। জনস্বার্থে এবং কোমলমতি শিশুদের সুরক্ষায় অবিলম্বে এই মরণফাঁদ দূর করে একটি নতুন ও টেকসই সেতু নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী।

Tag :

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

জনপ্রিয়

ঝুঁকিতে হাজারো মানুষ

পাইকগাছায় মরণফাঁদে পরিণত খড়িয়া-ভড়েঙ্গা ব্রিজ

প্রকাশিত সময় ০১:২০:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

খুলনার পাইকগাছা উপজেলার লস্কর ইউনিয়নের খড়িয়া-ভড়েঙ্গা চক গ্রামে ভড়েঙ্গা খালের ওপর নির্মিত সেতুটি এখন এলাকাবাসীর জন্য এক চরম আতঙ্কের নাম। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারহীন অবস্থায় পড়ে থাকা এই সেতুটি বর্তমানে সম্পূর্ণ চলাচলের অযোগ্য হয়ে ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। সেতুর মাঝখানে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় এবং মূল কাঠামোর কংক্রিট খসে পড়ে মরিচাপড়া লোহার রড বেরিয়ে আসায় যেকোনো মুহূর্তে এটি ধসে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে স্থানীয় খড়িয়া সবুজ পল্লী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই ভাঙা সেতু পার হয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৩০ বছর আগে নির্মিত এই সেতুর মাঝ বরাবর দুটি বড় অংশ ধসে গিয়ে নিচের খালের পানি সরাসরি দৃশ্যমান হচ্ছে। পুরো সেতুজুড়ে অসংখ্য ফাটল ও ক্ষয় ধরেছে। দুই পাশের রেলিং বহু আগেই ভেঙে পড়েছে, যেখানে এখন শুধু জং ধরা রডের কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে। সেতুর নিচের পিলারগুলোও নোনা পানির প্রভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এছাড়া সেতুর দুপাশের সংযোগ সড়ক (অ্যাপ্রোচ রোড) না থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা তাপসী, অনিমা মন্ডলরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বহু বছর ধরে সেতুটি এই জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে, কিন্তু এটি সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রতিদিন আমাদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা এই ভাঙা সেতুর ওপর দিয়ে স্কুলে যায়। সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয়, কখন কী দুর্ঘটনা ঘটে যায়।” আরেক বাসিন্দা উত্তম, প্রসেনজিৎ, উজ্জ্বল মন্ডল জানান, বর্ষা মৌসুমে এবং রাতের অন্ধকারে এই পথ দিয়ে চলাচল করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সামান্য অসাবধানতার কারণে যেকোনো সময় বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে। শুধু স্কুলগামী শিশুরাই নয়, এই সেতুর জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় কৃষক, মৎস্যজীবী ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা। এলাকাটি কৃষি ও মৎস্যপ্রধান হওয়ায় উৎপাদিত নিত্যপণ্য ও মাছ যথাসময়ে বাজারে আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া গ্রামে কেউ হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার মতো কোনো জরুরি যাতায়াত ব্যবস্থাও এখন আর অবশিষ্ট নেই। এ বিষয়ে লস্কর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “ব্রিজটি প্রায় তিন দশক আগের। এলাকার অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে এর ঢালাই ও ভেতরের রড সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এটি এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অবর্ণনীয় এই দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পেতে এখানে একটি নতুন ব্রিজ নির্মাণ করা জরুরি প্রয়োজন। যোগাযোগ করা হলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রাজিব বিশ্বাস জানান, “সেতুটি আসলেই বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। সরকারি নতুন বরাদ্দ পেলেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এখানে একটি নতুন সেতু নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।”
কোনো বড় ধরনের প্রাণহানি বা মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর যেন কর্তৃপক্ষের ঘুম না ভাঙে- এমনটাই দাবি স্থানীয় ভুক্তভোগীদের। জনস্বার্থে এবং কোমলমতি শিশুদের সুরক্ষায় অবিলম্বে এই মরণফাঁদ দূর করে একটি নতুন ও টেকসই সেতু নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী।