সাতক্ষীরার তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা বাজারের নৌকার কদর রয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল জুড়ে। এখানে সর্বক্ষণ নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা যায় কারিগরদের। আষাঢ়-শ্রাবণের টানা বর্ষণে নদী-নালা, খাল-বিল ও মৎস্যঘের কানায় কানায় পূর্ণ হতেই প্রাণ ফিরে পেয়েছে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী পাটকেলঘাটা নৌকাপল্লি। খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা বলিফিল্ড মোড় থেকে মজুমদার পেট্রোল পাম্প পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা এখন দিন-রাত মুখরিত হাতুড়ি আর করাতের ঠুকঠাক শব্দে। মানসম্মত কাঠ, টেকসই গঠন ও দীর্ঘস্থায়িত্বের কারণে পাটকেলঘাটার নৌকার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের দুপাশের ১৫টি কারখানায় কাজের তিল পরিমাণ ফুরসত নেই কারিগরদের। বছরের অন্য সময় বেচাকেনা কিছুটা মন্থর থাকলেও বর্ষা নামতেই এখানে ক্রেতাদের ভিড় জমেছে। সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলাসহ খুলনা, যশোর, বাগেরহাট ও নড়াইল থেকে প্রতিদিন জেলে, ঘেরমালিক ও মাছচাষিরা আসছেন পছন্দের নৌকা কিনতে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কারখানা মালিকদের আশা, চলতি মৌসুমে এই পল্লিতে তিন থেকে চার কোটি টাকার নৌকা কেনাবেচা হবে।
কারিগরদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মেহগনি, খৈ, চাম্বল, রেইনট্রি (লম্বু), শিরীষ ও পিতরাজ কাঠ দিয়ে তৈরি হচ্ছে ছোট-বড় ডিঙি, কোষা, পালতোলা নৌকা এবং নানা আকারের ইঞ্জিনচালিত ট্রলার। কাঠের জাত ও আকারের ওপর ভিত্তি করে নৌকার দামে রয়েছে ভিন্নতা ছোট ডিঙি নৌকা ১০ থেকে ২৫ হাজার টাকা, ৫ হাত শিরীষ কাঠের নৌকা ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা, ১৫ হাত খৈ কাঠের নৌকা ২০ থেকে ২৭ হাজার টাকা, ভালো মানের ইঞ্জিনচালিত নৌকা ৫০ হাজার থেকে দেড় লক্ষ টাকা এবং ৪৫ হাত ইঞ্জিনচালিত ট্রলার (সামুদ্রিক নৌকা) ৩ থেকে ৮ লক্ষ টাকা বা তার বেশি বিক্রি হচ্ছে।
বর্তমানে এই পল্লিতে কাজ করছেন প্রায় দুইশত অভিজ্ঞ কারিগর। দীর্ঘ ২৫-৩০ বছর ধরে এই পেশায় যুক্ত কাঠমিস্ত্রি মোজাফফর রহমান বলেন, “১৫ থেকে ২০ হাতের একটি নৌকা তৈরি করতে আমাদের ৩-৪ দিন সময় লাগে। কাজ শেষে আমরা ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা মজুরি পাই। আমরা শুধু শ্রম দিই; কাঠ, পেরেক, তারের কাঁটা ও আলকাতরাসহ যাবতীয় সরঞ্জাম মহাজন সরবরাহ করে থাকেন।”
তবে কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিক বাড়ায় হাড়ভাঙা খাটুনির তুলনায় লাভ কমে গেছে বলে জানান মেসার্স ঐশী নৌকা কারখানার মালিক শেখ আনোয়ার হোসেন। কাঁচামালের সংকট, মূলধনের অভাব এবং আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতিকে এই ব্যবসা প্রসারের প্রধান বাধা হিসেবে দেখছেন তাঁরা।
শেখ আনোয়ার হোসেন আরও জানান, ‘২০০০ সাল থেকে নৌকা তৈরি করি। তখন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হওয়ায় বেচা-বিক্রি বেশি হয়েছিল। বর্তমানে এখানে গড়ে উঠেছে নৌকার হাট। ছোট নৌকার মূল্য ১০ হাজার থেকে ২৫ হাজার। আর ৪৫ হাত লম্বা ইঞ্জিনচালিত সামুদ্রিক নৌকার ৩ থেকে ৮ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হয়।’
সামুদ্রিক নৌকা তৈরির কারিগর সদরুল গাজী ও শেখ হেলাল হোসেন জানান, ‘একটি সামুদ্রিক নৌকা ৪/৫ জন মিলে তৈরি করতে প্রায় দুই মাস সময় লাগে। একটি নৌকা তৈরি করলে তারা প্রায় ২ লাখ টাকা পান। সামুদ্রিক নৌকাগুলো মেহগনি কাঠ দিয়ে তৈরি করলে সব থেকে মজবুত হয়। সমুদ্রের ঝড়-তুফানের মধ্যে চলাচলের উপযোগী করেই তৈরি করা হয় নৌকাগুলো।’
তালা সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ তারিক ইমাম বলেন, অত্র উপজেলা হতে জেলেরা অনেক ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে সুন্দরবনের দুবলারচরসহ বিভিন্ন স্থানে মাছ ধরতে যায়। এরমধ্যে ৯৩টি ইঞ্জিনচালিত নৌকার তথ্য তাদের দপ্তরে রয়েছে।
এদিকে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ইতিবাচক উদ্যোগের কথা জানিয়েছে স্থানীয় বিসিক। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), সাতক্ষীরার উপব্যবস্থাপক গৌরব দাস বলেন, “পাটকেলঘাটার নৌ শিল্পোদ্যোক্তাদের পর্যায়ক্রমে বিসিকের নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। তাঁদের দক্ষতায় উন্নীত করতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং আবেদন সাপেক্ষে সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ পেতে প্রয়োজনীয় সব প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করা হবে।”
শিরোনাম :
পাটকেলঘাটায় নৌকা তৈরিতে ব্যস্ত কারিগররা
-
তালা প্রতিনিধি - প্রকাশিত সময় ০৪:৩৩:১৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
- ২৯ পড়েছেন
Tag :
জনপ্রিয়
















