১২ মার্চ ২০২৬। টেবিলের মুঠোফোনটি বেজে উঠতেই বুঝলাম—নতুন কোনো কেস। ওপাশ থেকে একটি কারাগারের জেল সুপার জানালেন, ২০২১ সালে মারা যাওয়া প্রবীর মন্ডল নামের এক ভারতীয় নাগরিকের মরদেহ চার বছর ধরে রংপুরে পড়ে আছে। যদি কিছু করা যায়!
কাগজপত্র ঘেঁটে জানা গেল, প্রবীর মন্ডলের বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনার বরানগরে। ২০২১ সালের নভেম্বরে এক সঙ্গিনীকে নিয়ে বাংলাদেশে এসে লালমনিরহাটের এক পরিচিতের বাড়িতে ঘুমন্ত অবস্থায় তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান। পুলিশ অপমৃত্যুর মামলা করে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। কিন্তু তারপর থেকে আর কেউ তাঁর খোঁজ নেয়নি।
তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে একের পর এক গা শিউরে ওঠা সত্য সামনে এলো। ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাস বা বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়—কেউই এ বিষয়ে কিছু জানত না। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়, হাসপাতালের হীমঘরের কারিগরি ত্রুটির কারণে পাঁচ বছরে সেই তাজা মানুষটির দেহ পচে-গলে এখন স্রেফ কঙ্কালে রূপ নিয়েছে!
এপ্রিলের শুরুতে আমি নিজে রংপুর মেডিকেলে ছুটি। হাসপাতালের পরিচালক কিংবা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ—কারো জানা ছিল না যে মর্গে একজন বিদেশি নাগরিকের দেহ পড়ে আছে। অনুমতি নিয়ে বিষাক্ত উৎকট গন্ধে ভরা সেই অন্ধকার মর্গে ঢুকলাম। বছর কয়েক আগে ছবিতে দেখা মানুষটির কঙ্কাল রূপ দেখে শরীর শিউরে উঠল। কলেজ কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দিল—এই কঙ্কাল হাসপাতালের গবেষণার কাজেও আর আসবে না।
আমার অনুরোধে কলকাতার সাংবাদিক ও পরিচিতদের মাধ্যমে প্রবীরের ভাই সমীর মন্ডলের সাথে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু সীমান্তের ওপারের পরিবার এই ঝামেলার দায় নিতে অস্বীকার করল। প্রবীরের ভাই জানিয়ে দিলেন, “আমাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক ছিল না, আমরা কিছু করতে চাই না।”
পরিবার মুখ ফিরিয়ে নিলেও একজন মানুষ হিসেবে প্রবীরের শেষ পরিণতি এভাবে হতে দিতে পারি না। যশোরের কারাগারে মারা যাওয়া উত্তরপ্রদেশের সমীরের কথা মনে পড়ে গেল—যার লাশ ১৯১ দিন পর সরকারিভাবে সৎকার করা হয়েছিল। প্রবীরের ভাগ্যে কি তা-ও জুটবে না?
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, পরিবার না নিলে নিজ দায়িত্বে ধর্মীয় আচার মেনে তাঁর দাহ সম্পন্ন করব। ১২ এপ্রিল ঢাকার ভারতীয় দূতাবাসে চিঠি পাঠালাম—আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহটি যেন আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আমার এই আবেদনের পর প্রশাসনের দপ্তরগুলোতে নড়াচড়া শুরু হলো; দীর্ঘদিন পর রংপুর মেডিকেলের মর্গ ও কুলিং সিস্টেম মেরামত করা হলো।
ওদিকে রংপুরের স্থানীয় বিত্তশালী সনাতন ধর্মাবলম্বী, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট এবং সিটি কর্পোরেশনের সাথে যোগাযোগ করে দাহ করার সব প্রস্তুতি গুছিয়ে রাখলাম। ভারতীয় দূতাবাস থেকে কলকাতার বিধাননগর পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে চিঠি গেছে, সেখান থেকে পরিবারের চূড়ান্ত অনাপত্তিপত্র পেলেই শুরু হবে শেষ পর্ব।
যে মানুষটির খোঁজ কেউ রাখেনি, মৃত্যুর পর যার শরীর থেকে মাংস ঝরে হাড়ের কঙ্কাল তৈরি হয়েছে—সেই অচেনা প্রবীরকে অন্তত একটু মানবিক মর্যাদা দিয়ে বিদায় জানানোর এই অপেক্ষায় দিন গুনছি।
মোঃ শামসুল হুদা 










