একই পরিবারের দুই বোনসহ গেল চারদিনে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাহার ধস থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ১৬ জনকে। ঝুকিতে রয়েছে কয়েকলাখা রোহিঙ্গা।
কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসে মহিলা মাদ্রাসা ও হেফজখানার ওপর পড়ে আট শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।ক্যাম্প প্রশাসনের সহযোগিতায় লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মুজিবুর রহমান জানিয়েছেন। এসময় ঘটনাস্থল থেকে আহত অবস্থায় ১৬ জন জীবিত উদ্ধার করে ক্যাম্প অভ্যন্তরের থাকা এনজিও সংস্থার পরিচালনাধীন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়ে বলে রোহিঙ্গা নেতা আলী আকবর জানিয়েছেন। বুধবার (৮ জুলাই) দুপুর আড়াইটার দিকে উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এ-৩ ব্লকের খাদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদ্রাসা ও হেফজখানায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। ।
নিহতরা হলেন উখিয়ার কুতুপালং ৩ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এফ-১ ব্লকের বাসিন্দা আব্দু শুক্কুর মেয়ে
উম্মে সালমা (১২),তার বোন উম্মে নাজাত (১৩),একই রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জি-৮৩ ব্লকের বাসিন্দা শামসু আলমের মেয়ে শাহিদা (১৩),উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এ-৮ ব্লকের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইলিয়াসের মেয়ে ওনাইসা বিবি (১৩),একই রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এ-১১ ব্লকের বাসিন্দা হাশিম উল্লাহর মেয়ে রাশিদা (১৬)। এ রিপোর্ট লেখাকালীন পর্যন্ত বাকী তিনজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি।
গুরুতর আহতরা হলেন উখিয়ার কুতুপালং ৩ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পর এফ-৭৫ ব্লকের বাসিন্দা দিল মোহাম্মদ মেয়ে আরসা (৯),একই রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এফ-১ ব্লকের বাসিন্দা নুরুল আমিনের মেয়ে বেগম জান(১৫),একই রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জি-৮৩ ব্লকের বাসিন্দা মোহাম্মদ আজিজ এর মেয়ে জান্নাত আরা বিবি (০৮),এফ-৬৬ ব্লকের বাসিন্দা শাহ আলমের মেয়ে নূর ফাতেমা (১০), ক্যাম্প-৫ এর বাসিন্দা বশির আহমদের মেয়ে ফারেসা বিবি (১২),একই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এ-২ ব্লকের বাসিন্দা নুর সেহেরা (১২),একই ব্লকের বাসিন্দা ইমাম হোসেনের ছেলে আব্দুল মোনাফ (১৭) ও আব্দু শুক্কুর ছেলে নূর কায়েস (১০)। এদের মধ্যে ছয়জন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অভ্যন্তরের থাকা জিকে,গণস্বাস্থ্য ও ফেন্ড্রশীপ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়িতে চলে যান বলে ওই ক্যাম্পের হেড মাঝি হামিদ উল্লাহ জানিয়েছেন। এছাড়া দুইজনের অবস্থা আশংকাজনক হওয়ায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে রেফার করা হয় বলে ৩ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি রশিদ উল্লাহ জানিয়েছেন। এ ঘটনার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছেন।প্রায় চারঘন্টা ব্যাপী ফায়ার সার্ভিসের নেতৃত্ব ও সিসিসিএমের স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় সন্ধ্যা ৬টার দিকে উদ্ধার অভিযান শেষ হয়। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান পাহাড় ধসের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন এ পর্যন্ত আটজনের মৃত্যু হয়েছে।এরমধ্যে চারজন ঘটনাস্থলে মারা যায়। বাকী চারজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।১৩ শিশুশিক্ষার্থীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস সুত্রে জানা যায় টানা ভারী বর্ষণের মধ্যে দুপুরে হঠাৎ পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে মাদ্রাসা ও হেফজখানার ওপর পড়ে। এতে মাদ্রাসার শিশুশিক্ষার্থী মাটির নিচে চাপা পড়ে। পরে হতাহতদের উদ্ধার করা হয়। চার ঘণ্টা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে আট শিশুর লাশ এবং ১৩ শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গা সামাদ বলেন, ঘটনাস্থলে মেয়েদের একটি মাদ্রাসা এবং তার ওপরে একটি মক্তব ছিল। মাটি ভরাট করে মাদ্রাসাটি নির্মাণ করা হয়েছিল। টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের ঢাল ধসে মাদ্রাসাটির ওপর পড়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে।প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুরে ভারী বৃষ্টির সময় পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে মাদ্রাসার ওপর আছড়ে পড়ে। সে সময় ভেতরে ২০ জনের বেশি শিশু কোরআন শিক্ষা গ্রহণ করছিল। মুহূর্তেই সেখানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট, এপিবিএন সদস্য, স্থানীয় রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবক এবং বিভিন্ন মানবিক সংস্থার কর্মীরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে হতাহতদের উদ্ধার করা হয়। উখিয়ার ৩ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের হেড মাঝি রশিদ উল্লাহ বলেন, “আমাদের ক্যাম্পের একই পরিবারের দুই শিশুসহ তিনজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।আরেকজন আহত হয়।বর্তমানে ক্যাম্পের অভ্যন্তরের থাকা একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছে
৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের হেড মাঝি হামিদ উল্লাহ জানান, ওই ঘটনায় তিনজনের মৃত্যুর খবর তিনি নিশ্চিত হয়েছেন।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত কয়েকদিন ধরে উখিয়া ও আশপাশের এলাকায় টানা ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। অব্যাহত বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে যায়। বুধবার দুপুরের দিকে হঠাৎ মাদ্রাসার পাশের পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই পাহাড়ের মাটি মাদ্রাসার একটি অংশের ওপর আছড়ে পড়ে এবং সেখানে থাকা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা মাটির নিচে চাপা পড়েন।
উখিয়ার ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ সিরাজ আমিন বলেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।এর মধ্যে ১৩ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছে। উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সিনিয়র স্টেশন কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা বলেন আটজনের মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। বাকী ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন আটজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।এ ব্যাপারে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান বলেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১৩ জন আহত হওয়ার খবর শুনেছি।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, বুধবার সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টায় কক্সবাজারে ৫১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।উল্লেখ্য, বর্ষা মৌসুমে উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি প্রতিবছরই বেড়ে যায়। পাহাড় কেটে তৈরি করা বসতি, অতিবৃষ্টি এবং দুর্বল মাটির কারণে এসব এলাকায় প্রায়ই ভূমিধসের ঘটনা ঘটে।এর আগে সোমবার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে আটজন এবং কক্সবাজার শহর ও পেকুয়ায় পাহাড়ধসে আরও দুজনের মৃত্যু হয়। এছাড়া বৃষ্টির পানিতে ডুবে এক রোহিঙ্গাসহ দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে গত তিন দিনে কক্সবাজার জেলায় অন্তত ১৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
কক্সবাজার প্রতিনিধি 















